আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।
আবিদজানের যে একাডেমিতে ইয়ান দিওমান্দের ফুটবল-জীবনের শুরু, সেখানে ছেলেদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল ঘুরেফিরে একটাই: প্রতিদিন পেট ভরে খেতে পারা। একাডেমির কোচ হোসে হুলিয়ান লোপেজ মোরালেস একদিন ছেলেদের জিজ্ঞেস করেছিলেন একাডেমিতে তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী? তাদের উত্তর ছিল, “রোজ নিয়মিত খেতে পাওয়া।”
সেই খাবার আর পড়াশোনা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। যে ছেলেদের ঘরে দুবেলা ভাত জোটানোই কঠিন ছিল, তাদের কাছে ফুটবল মাঠ ছিল একই সঙ্গে স্বপ্নের জায়গা আর নিশ্চিত আশ্রয়। সেই দলেরই একজন ছিলেন দিওমান্দে। কোচের হিসাবে ওই একাডেমি থেকে উঠে আসা এগারোজন আজ ইউরোপে খেলছেন, আর বিশজনেরও বেশি খেলছেন আইভরি কোস্টের প্রথম বিভাগে। সবার ওপরে এখন রিয়াল মাদ্রিদের ২৫ নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামা সেই ছেলেটি, ইয়ান দিওমান্দে।
আবিদজানের সিকোগি এলাকার গলিতে একসময় খালি পায়ে বল পিটিয়ে বেড়াত একটা ছেলে। আজ সেই ইয়ান দিওমান্দে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর বাঁ প্রান্তে খেলছেন। বয়স এখনো কুড়ি পূর্ণ হয়নি, জন্ম ২০০৬ সালের ১৪ নভেম্বর।
গলির ফুটবল
আইভরি কোস্টের রাজধানী আবিদজানের ঘিঞ্জি পাড়ায় বড় হয়েছেন দিওমান্দে। সংসারে ছিলেন মা আর ছোট বোন রোকসান। বাবা কাজের খোঁজে চলে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে। সংসারে টানাটানি ছিল প্রতিদিনের।
ফুটবল খেলতে লাগে বুট, আর বুট কেনার টাকা ছিল না। দিওমান্দে নিজেই বলেছেন, আইভরি কোস্টে তারা বুট পরে খেলতেন না। যে মাঠ পাওয়া যেত, সেখানেই খেলা চলত। প্রথম জোড়া বুট কিনে দিয়েছিলেন অন্য একজন, কারণ তার বা তার পরিবারের কাছে তখন সেই টাকা ছিল না।

খুব অল্প বয়সেই এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ঘরের অবস্থা ভালো ছিল না, তাই বাড়ি ছেড়ে ফুটবলের জন্য একটি একাডেমির গ্রামে চলে যান। তার কথায়, তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন ফুটবল তার ভালোবাসা, আর এটা দিয়েই কিছু গড়া সম্ভব। সেই একাডেমি ছিল আকাদেমিয়া এএফআই সুদ কোমো। কোচ লোপেজ পরে বলেছেন, বল ছোঁয়া আর নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা দিওমান্দের মধ্যে একদম শুরু থেকেই চোখে পড়ত।
সাত সমুদ্র পেরিয়ে ফ্লোরিডায়
পনেরো বছর বয়সে এল বড় সুযোগ। আফ্রিকান তরুণ প্রতিভাদের যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিতে পাঠানোর একটি সংস্থার সুবাদে তিনি পৌঁছালেন ফ্লোরিডার ডেটোনা বিচের ডিএমই একাডেমিতে। ২০২২ সালের কথা। সেখানে ছিল না পরিচিত মুখ, ছিল না ভাষার জোর। ইংরেজি জানতেন না, ঘরের সঙ্গে সময়ের ব্যবধানও ছিল বিশাল। আমেরিকার খাবার তার কাছে অস্বাস্থ্যকর লেগেছিল। প্রথম কয়েক মাসের একাকিত্ব তিনি আজও ভোলেননি।
মোবাইলের অ্যাপে নিজে নিজে ইংরেজি শেখা শুরু করলেন। ঘরের সঙ্গীরা ছিল সেনেগালের ছেলেরা, ফরাসি-ভাষী। ফরাসি-ভাষী আফ্রিকান সহপাঠীরাই হয়ে উঠল তাঁর টিকে থাকার ভরসা। মাঠে অবশ্য ভাষার দরকার পড়ত না। সেখানে তিনি এতটাই ভালো ছিলেন যে একাডেমির সাধারণ ম্যাচে তাকে আর পরীক্ষা করা যেত না। কোচেরা তাই মেজর লিগ সকারের যুব দলগুলোর সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খুঁজতে শুরু করলেন।
২০২৩ সালে একাডেমির সহযোগী ক্লাব এএস ফ্রেনজির হয়ে ইউনাইটেড প্রিমিয়ার সকার লিগের শিরোপা জেতেন। দল সেই মৌসুমে অপরাজিত ছিল। একই বছরের অক্টোবরে স্কটল্যান্ডের র্যাঙ্গার্সে ট্রায়াল দিলেন। চুক্তি হয়নি, তিনি ফিরে গেলেন ডিএমইতে।
ইউরোপের দরজায়
আইভরি কোস্টের একাডেমির সেই পরামর্শদাতাই তাকে জানিয়েছিলেন লেগানেসের আগ্রহের কথা। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর স্পেনের ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তি হলো, জানুয়ারিতে তিনি যোগ দিলেন। ২০২৫ সালের মার্চে অভিষেক হলো সরাসরি রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে, ৮৫ মিনিটে বদলি হিসেবে নেমে। দল হারল ৩-২ ব্যবধানে। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটেই ফেদেরিকো ভালভের্দেকে ড্রিবল করে বেরিয়ে গেলেন, যেন কোনো ব্যাপারই নয়।
ওই সময়ই এল জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত। লেগানেসে অভিষেকের কয়েক সপ্তাহ পর মারা যান তার বোন রোকসান, বয়স ছিল মাত্র ১৫। ছোটবেলা থেকে যে মেয়েটি ভাইয়ের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসী ছিল, সে-ই আর রইল না।
লাইপজিগে বিস্ফোরণ
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই আরবি লাইপজিগের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করেন দিওমান্দে। জার্মানির বুন্দেসলিগায় গতি আর ড্রিবলিংয়ে তিনি দ্রুতই নজর কাড়লেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৩৩ ম্যাচে ১২ গোল করলেন, যা এক তরুণ উইঙ্গারের জন্য চোখে পড়ার মতো হিসাব।
২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রথমবার ডাক পেলেন আইভরি কোস্টের জাতীয় দলে। সেই সময়ের মধ্যেই দলের হয়ে তিন গোল করে ফেললেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে করলেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ অ্যাসিস্ট।

মাদ্রিদের ডাক
পিএসজি আর প্রিমিয়ার লিগের কয়েকটি ক্লাবও আগ্রহী ছিল। তবে তার এজেন্ট জানিয়েছেন, তিনি প্রথম দিকের কথাবার্তাতেই বলেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদ তার স্বপ্নের ক্লাব। ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট সাত বছরের চুক্তিতে, ২০৩৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত, মাদ্রিদে যোগ দিলেন তিনি। ট্রান্সফার ফি প্রায় ১২৫ মিলিয়ন ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। সঙ্গে সর্বোচ্চ আরও ১৫ মিলিয়ন ইউরোর বোনাস রয়েছে, সব মিলিয়ে অঙ্কটা দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এই অঙ্কে তিনি জুড বেলিংহামকে ছাড়িয়ে ক্লাবের সবচেয়ে দামি সই এবং ইতিহাসের সবচেয়ে দামি আফ্রিকান খেলোয়াড়। রিয়ালে তিনিই প্রথম আইভোরিয়ান। জার্সি নম্বর ২৫।
এখনকার দিওমান্দে
নতুন কোচ জোসে মরিনিও অবশ্য তাকে শুধু ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন না। ভিনিসিয়ুস না থাকা ম্যাচে বাঁ প্রান্তে তাকে শুরুর একাদশে নামিয়েছেন, আর দিওমান্দে সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। ১০ অক্টোবর ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানের জয়ে রিয়ালের হয়ে প্রথম গোলটি করেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও গড়েছেন রেকর্ড: একই ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করা সবচেয়ে কম বয়সী রিয়াল বদলি খেলোয়াড় তিনি, গুতির ১৯৯৯ সালের রেকর্ড ভেঙে। এ পর্যন্ত রিয়ালের হয়ে ১৪ ম্যাচে ৪ গোল।
বার্নাব্যুতে এখন তাকে ঘিরে আলোচনা হচ্ছে, এমনকি ভিনিসিয়ুসের ভবিষ্যৎ নিয়েও। অথচ বয়স তার এখনো ১৯। আর তার জন্মদিন আসতে আর মাত্র ১১ দিন বাকি।
যে ছেলে একদিন বুট কেনার টাকা পেত না, সে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠে নামে। তার নিজের কথা অনুযায়ী, আবিদজানে ফোন করে পরিবারের খবর নেওয়াটাই এখনো তাঁকে মাটির সঙ্গে বেঁধে রাখে।
সূত্র: Wikipedia, ESPN, CNN, Yahoo Sports, Bundesliga.com, DME Academy, Red Bull








