বোরো উৎপাদনে ব্যয় বেড়েছে ॥ ঋণের বোঝা বৃদ্ধির আশংকায় কৃষকের দুশ্চিন্তা

মোঃ হেলাল উদ্দিন।।
কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওর এলাকা হিসেবে পরিচিত নিকলী উপজেলা। এখানকার শতকরা ৯৫% ভাগ মানুষই কৃষক। অত্র উপজেলায় এবার প্রায় ১৫ হাজার ২ শত ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করা হয়েছে। ৫ হাজার ৪ শত ৮০ হেক্টর জমিতে ২৮ ব্রি ধান, ৬ হাজার ৬ শত ১২ হেক্টর জমিতে ২৯ ব্রি ধান, ৩ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান, ৪০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় ধান ও ৮ হেক্টর জমিতে অন্যান্য জাতের ধান চাষাবাদ করা হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ শত ৮০ কোটি টাকা।

2015-04-12-08.42.48
কৃষকেরা বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো বৈশাখী ধান উৎপাদন করে। উপজেলার সকল হাওরে এখন সবুজের অবারিত ফসলের মাঠ। হাওরের যেদিকেই চোখ যায় শস্য শ্যামল সবুজের প্রতিচ্ছবি, যে প্রাকৃতিক দৃশ্য হৃদয় ছুয়ে যায়। আর কদিন পরেই শুরু হবে ধান কাটার মহোৎসব, ধান কাটা যেন এই অঞ্চলের কৃষক-কৃষানীদের অনন্য এক তৃপ্তির আনন্দ ফুয়ারা। ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের চাষিরা ধান কাটার পূর্ব প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বৈশাখ মাসে দেখা দেয় এই এলাকার শ্রমিক সংকট। তাই কৃষকেরা অন্যান্য জেলা ও উপজেলার শ্রমিকদের সাথে যোগাযোগ করে শ্রমিক ঠিক করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছে। ধানের পুরনো গোলা মেরামত ও ধান কাটার উপকরণ, মাড়াই মাঠ, কাস্তে, বাঁশের ঝুড়ি, চালুন, লোহার বিন্দা ক্রয় করতে বাজার মুখি হচ্ছে কৃষকেরা। এই বহু কাংখিত বৈশাখী ফসলের উপর নির্ভর করবে চাষি পরিবারগুলোর, মহাজনের ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করার পর আগামী এক বছরের যাবতীয় সংসার খরচ।
হাওরে পরিদর্শনে গেলে কৃষকদের সাথে এবারকার ফসল উৎপাদনের ব্যয় নিয়ে কথা হলে কৃষিপণ্য ডিজেল, সার, কীটনাশক, বীজ, ধান সেচ ভাড়া (ইঞ্জিন), হাল চাষের ভাড়া (ডিলার), বীজ তলা নির্মাণ ও চারা উত্তোলন, ধান কাটা, জমি নিরানী ও শ্রমিক মুজুরী সহ সমুদয় খরচের কাত উল্লেখ পূর্বক দামপাড়া গ্রামের কৃষক মোঃ সাইফুল ইসলাম, সিংপুর গ্রামের কৃষক শান্তি রহমান, ডুবি গ্রামের কমল মিয়া ও নানশ্রী গ্রামের কৃষক তারা মিয়া এই প্রতিনিধিকে জানায় আমাদের হাওর এলাকার জমির আঞ্চলিক হিসেবে ৩৫ শতাংশ জমিতে (এক কানি) ধান ফলাতে কৃষকের খরচ হয় বীজ তলা তৈরী, শ্রমিক সহ ৫০০, বীজ ধান ক্রয় ৩৫০, বীজ জমিতে হাল চাষ (টিলার) ১ হাজার, বীজ তলা থেকে চারা উত্তোলন ৩৫০, েেত ধানের চারা রোপন ১ হাজার ৫০০, জমির রোপনের সময় সার ১ হাজার, আগাছা পরিস্কার ৫০০, জমির রোপনের পর ইউরিয়া সার ১ হাজার ৫০০, বিভিন্ন প্রকার বিষ প্রয়োগ ৪০০, সেচ খরচ (ডিজেল) কার্তিক মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ৮০০, সেচ দেওয়ার ইঞ্জিন ভাড়া ১ হাজার, ধান কাটা ৩ হাজার ৫০০, ধান মাড়াই ও শুকানো ৭০০, অন্যান্য ২০০ ও জমি লিজ নিলে ৫ হাজার টাকা সর্বমোট ২০ হাজার ৩০০ টাকা বেশি কৃষকের খরচ হয়। জমিতে ধান উৎপাদন হবে ২০ মণ। বৈশাখ মাসে ৫০০ টাকা দরে ধান বিক্রয় করলে তার মূল্য ১০ হাজার টাকা। লিজি চাষিদের প্রতি মণ ধানে মূল্য জমিতে পরবে ৯৯০ টাকা। দিন দিন এসব চাষিরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।


কৃষক সূত্রে জানা যায়, মহাজনদের ঋণ পরিশোধ করে তাদের গোলায় কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। মাঠ পর্যায়ে কৃষি সহকারি অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বোরো ফসল উৎপাদন করতে কৃষি জমিতে কি পরিমাণ সার ও রোগ বালায়ে কি ধরনের ঔষধ জমিতে প্রয়োগ করতে হবে সে ধরনের কেন উপদেশ এবং মাঠ পরিদর্শনে তারা আসছে না। সরকারি ভাসমান বড় প্রকল্পের অনিয়মের কথা কৃষকেরা উল্লেখ করে বলেন, সরকারি ভাবে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
নিকলী কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ও উর্ধ্বতন উপ-সহকারি প্রকৌশলী বিএডিসি নিকলী মোঃ রফিকুল ইসলামের সাথে কৃষকদের অভিযোগ নিয়ে কথা হলে তারা জানান এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন, তবে আমাদের কাছে লিখিত কোন অভিযোগ আসছে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। স্থানীয় কৃষকদের বক্তব্য এ এলাকায় প্রায় ২ হাজার ১৩২ টি গভীর ও অগভীর পাওয়ার পাম্প রয়েছে। যদি অত্র উপজেলায় নদীর ও বিলগুলো ডেজিং করে বিদ্যুৎ চালিত ভাসমান সেচ পাম্প ও পাখা নালা, হাওর রার বাঁধ নির্মাণ করা হলে কৃষকদের ধান উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে এবং লাখ লাখ টন ধান বেশি উৎপাদন হবে, তবেই কৃষকরা ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাবে। বর্তমানে ৫০০ টাকা মণে ধান বিক্রি হওয়ায় কৃষকেরা হতাশা গ্রস্থ হয়ে পড়েছে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!