নুনমিঠাই: এক টুকরো মিষ্টিতে লুকিয়ে থাকা শৈশবের গল্প

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু নদী ও বন্যার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের জীবিকা ও সংগ্রামের অনন্য ইতিহাস। একসময় গোবরের লাকড়ি, খরস্রোতা নদীতে জেলেপেশা, কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ—এসবের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক পেশাই আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই হারানো ঐতিহ্য ও টিকে থাকা সংগ্রামের গল্প নিয়ে শুরু হয়েছে নিকলীকেন্দ্রিক প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর ধারাবাহিক ফিচার প্রতিবেদন—“হাওরাঞ্চলের ব্যতিক্রমী জীবিকা”। আজ থাকছে “নুনমিঠাই: এক টুকরো মিষ্টিতে লুকিয়ে থাকা শৈশবের গল্প

মোহাম্মদ তোফায়েল আহছান ।।

সকালের মিষ্টি আলোর আভা কাটেনি পুরোপুরি। হঠাৎ দূরে কোথাও ভেসে আসে পরিচিত এক ডাক—“নুনমিডাই রাকবাইন, নুনমিডাই!” সাথে চিরচেনা সেই ঘন্টাধ্বনি। হঠাৎই পুরো গ্রামের শিশু-কিশোরদের মাঝে ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। উঠোন ছেড়ে বেরিয়ে আসে রাস্তায়। কেউ হাতের মুঠোয় পুরনো টিনের টুকরো, কেউবা মরিচাধরা লোহার ছোট অংশ আঁকড়ে ধরে। বিক্রেতার কাঁধ থেকে ভার নামাতেই দেখা যায়, সারি সারি সাজানো কুড়মুড়ে, বাদামি-সোনালি রঙের মিষ্টি—নুনমিঠাই।

নুনমিঠাই—আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে অমলিন এক মুখরোচক খাবার। বাইরে কুড়মুড়ে, ভেতরে ফাঁপা, হালকা শক্ত, কিন্তু মুখে নিলেই গলে যেত মিষ্টি স্বাদে। গরম রোদে বা শীতের সকালে, এক টুকরো নুনমিঠাই যেন ছিল শিশুমনের রাজ্যের মুকুট।

দেশের অনেক জায়গায় এই মিষ্টিকে “কটকটি” নামে চেনে মানুষ। কিন্তু কিশোরগঞ্জ ও আশপাশের গ্রামীণ জনপদে এর নাম ছিল “নুনমিঠাই”—স্থানীয় উচ্চারণে “নুনমিডাই”। নামের ভিন্নতা থাকলেও একটাই জিনিস সবার মনে অমলিন হয়ে আছে—এক টুকরো নুনমিঠাই মানেই এক টুকরো শৈশব, এক চুমুক স্মৃতির মিষ্টি স্বাদ।

বিক্রেতার হাঁক আর শিশুর উচ্ছ্বাস
ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। গ্রামের মেঠো পথ, অলিগলিতে ভেসে আসে এক পরিচিত সুরেলা ডাক—‍“নুনমিডাই রাকবাইন, নুনমিডাই!” এই ডাক শুনলেই যেন প্রাণ ফিরে পেত গ্রাম। শিশু-কিশোররা দৌড়ে বেরিয়ে আসত উঠোনে, কেউ জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিত বিক্রেতাকে দেখার আশায়।

টাকায় নুনমিঠাই কেনা যেত না। এই মিষ্টি পেতে হলে দরকার ছিল ভাঙাচোরা টিন, ছেঁড়া স্যান্ডেল, ভাঙা কাঁচ, প্লাস্টিকের জিনিসপত্র, লোহা-লক্কর বা কোনো ধাতব বস্তু। শিশুরা দৌড়ে যেত বাড়ির আনাচে-কানাচে, বাতিল হওয়া চিনামাটির তৈজস, ভাঙা পাতিল কিংবা যা-ই পেত, সঙ্গে নিয়ে ছুটতো। চোখের আন্দাজে এসবের বিনিময়ে বিক্রেতা ছুরি দিয়ে কেটে দিতেন এক টুকরো নুনমিঠাই। দামাদামিও হতো—
“এইটুকু না, আরেকটু দেন!”
বিক্রেতার উত্তর, “না না, এইটুকই ঠিক আছে, বেশি দিলে পুষায় না।”

কাঁধে বয়ে নিয়ে আসা ফেরিওয়ালার সেই বাঁশের ভারে এক প্রান্তে টিনের তৈরি লম্বা আকারের বিশেষ বাক্সে সাজানো থাকত নুনমিঠাই। অন্য প্রান্তে রাখা হতো নুনমিঠাইয়ের সাথে বিনিময় করা পুরনো ধাতব বস্তু। সাধারণত দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা, দেড় ফুট চওড়া এবং দুই-তিন ইঞ্চি পুরু সেই টিনের ফ্রেমে ভরে রাখা হতো বাদামি-সোনালি রঙের মিষ্টি টুকরোগুলো। গ্রাম ঘুরে ঘুরে বিক্রি হতো এই মিষ্টি খাবারটি।

যখন কোনো শিশু কিছু না পেত, তখন ঘরের পুরনো থালা, গ্লাস, এমনকি টিনের বেড়ার ঢিলা অংশ পর্যন্ত খুলে আনত। এতে মাঝে মাঝে মা-বাবা ক্ষুব্ধ হতেন, বিক্রেতার সঙ্গে বাগবিতণ্ডাও হতো। তবুও শেষে হাসিঠাট্টার মধ্যেই মিটে যেত সব, আর শিশুদের মুখে ফুটে উঠত সেই তৃপ্তির হাসি—নুনমিঠাই পেয়ে যেন রাজ্যজয়!

গ্রামীণ জীবনের সরল আনন্দ
সে সময়ের গ্রামীণ জীবনে আনন্দের উপকরণ ছিল সহজ, কিন্তু গভীর ও আন্তরিক। বিনোদন বা বিলাসের সুযোগ ছিল না বললেই চলে—তবুও ছোট্ট কিছু বিষয়েই মানুষের মুখে ফুটে উঠত নির্মল হাসি। একটি নুনমিঠাইয়ের টুকরো ঘিরে শিশুদের যে উচ্ছ্বাস তৈরি হতো, তা ছিল হৃদয়ছোঁয়া। সকালবেলার শিশিরভেজা মাটিতে খালি পায়ে দৌড়ে যেত তারা, বিক্রেতার হাঁক শুনে। সামান্য বাতিল হয়ে যাওয়া বস্তুগুলোর বিনিময়ে তারা পেত এক টুকরো মিষ্টি, আর সেই টুকরো যেন তাদের কাছে ছিল পৃথিবীর সেরা পুরস্কার।

পরিবারের প্রবীণরা বিষয়টি জানতেন বলেই বাড়ির ভাঙাচোরা জিনিসগুলো ফেলে দিতেন না। পুরনো হাড়ি-পাতিল, টিনের টুকরো কিংবা মরিচাধরা টিনের ঘরের বেড়ার অংশ—এসব আলাদা করে জমিয়ে রাখতেন। কারণ জানা ছিল, এগুলো একদিন কাজে লাগবে—কোনো দিন বিক্রেতা এসে হাঁক ছাড়লে সন্তান বা নাতি-নাতনি যেন খালি হাতে না ফেরে।

এই প্রথাটি শুধু বিনিময়ের নয়, বরং পারস্পরিক সম্পর্কের এক সামাজিক বন্ধনও তৈরি করেছিল। বিক্রেতা, শিশু এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিল একধরনের অঘোষিত বোঝাপড়া—কেউ ঠকাত না, কেউ রাগ করত না। নুনমিঠাইয়ের এক টুকরো মিষ্টি যেন এক টুকরো ভালোবাসা হয়ে ভাগ হয়ে যেত সবার মাঝে।

আজকের চোখে এই বিনিময় হয়তো ছোট বা অদ্ভুত মনে হতে পারে; কিন্তু তখনকার সেই সরল জীবনে এতে ছিল আত্মিক তৃপ্তি, পারস্পরিক আস্থা আর সমাজজীবনের নিখাদ উষ্ণতা।

বিক্রেতাদের বর্ণিল বণিক জীবন
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতেন নুনমিঠাই বিক্রেতারা—কেউ ভৈরব থেকে, কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগর বা কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে। আবার অনেকে আসতেন নোয়াখালী, পাবনা কিংবা সিরাজগঞ্জ দিক থেকেও। এসব বিক্রেতা সাধারণত একা আসতেন না; একেক দলেই থাকত ছয় থেকে সাতজন করে সদস্য। তারা বড় এক বা একাধিক নৌকায় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতেন হাওর বা নদীবেষ্টিত জনপদে।

প্রধান নৌকাগুলোই ছিল তাদের ভাসমান আশ্রয় ও ভান্ডার। সেই নৌকায় থাকত জ্বালানি কাঠ, লোহার ফ্রেম, কড়াই, গুড়, চিনি, বেকিং সোডা ও নানা উপকরণ। বড় নৌকার পেছনে বাঁধা থাকত এক বা একাধিক ছোট ডিঙি নৌকা—যেন চলন্ত দোকান। সকাল হলেই দলটি ভাগ হয়ে যেত উপদলে। ছোট নৌকায় করে আলাদা গ্রামে পাড়ি জমাত।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলত তাদের ফেরি। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে নুনমিঠাই বিক্রি করতেন। বিনিময়ে নিতেন ভাঙা টিন, পুরনো হাঁড়ি, মরিচা ধরা লোহা বা সংসারে অপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র। সন্ধ্যার মধ্যেই সবাই ফিরে আসতেন নির্দিষ্ট ঘাটে। দলের মধ্যে থাকতেন একজন অভিজ্ঞ সদস্য। সবার রান্নার দায়িত্ব থাকত তাঁর কাঁধেই। একই সাথে তিনি দলের সবাইকে পরিচালনার দায়িত্বও পালন করতেন। দলের অভিজ্ঞ এই পাঁচকই ঠিক করতেন—নৌকা কোথায় নোঙর করবে, কে কোন এলাকায় যাবে, কখন নতুন করে মিঠাই তৈরি হবে।

আসার সময় তারা আগেই কিছু নুনমিঠাই বানিয়ে ফ্রেমভর্তি করে সঙ্গে আনতেন। তবে চাহিদা বেশি হলে হাওরাঞ্চলে বসেই বানাতেন নতুন করে। এই কাজ তারা করতেন লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে—নদীর চরে, খোলা মাঠে বা নৌকার পাটাতনে। আগুন জ্বেলে কড়াই বসিয়ে সেখানে তৈরি হতো নতুন নুনমিঠাই।

তবে নুনমিঠাই বানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে তারা তেমন কথা বলতেন না। গ্রামের লোকজনের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন হাসি মুখে। তাদের এই রহস্যময় আচরণে মিঠাই তৈরির কাজটি গ্রামীণ মানুষের চোখে একধরনের রহস্যময় মনে হতো—যেন দূরদেশ থেকে আসা অচেনা কারিগররা গুড় ও চিনির ভেতর মেশাতেন মিষ্টির জাদু।

নুনমিঠাই প্রস্তুত প্রণালী
নুনমিঠাই তৈরির প্রক্রিয়া ছিল দেখতে যতটা সহজ, আসলে তাতে লুকিয়ে ছিল নিপুণতা আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ছোঁয়া। উপকরণ হিসেবে লাগত খুব অল্প কিছু জিনিস—গুড় বা চিনি, পানি, সামান্য বেকিং সোডা এবং কখনো কখনো বৈচিত্র্য আনতে খাদ্যমানের বাহারি রঙ।

প্রথমে বড় কড়াই বা পাতিলে পানি ও গুড় একসাথে বসানো হতো চুলায়। জ্বাল দিতে দিতে গুড় ধীরে ধীরে গলে যেত এবং ঘন হতে থাকত। তখন শুরু হতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—সিরার ঘনত্ব মাপা। অভিজ্ঞ নুনমিঠাই প্রস্তুতকারকেরা চামচে একফোঁটা সিরা নিয়ে ঠান্ডা পানিতে ফেলেই বুঝে যেতেন সঠিক মাত্রা হয়েছে কিনা। যদি সিরা সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে যেত, তবে বুঝতে হতো—সময় হয়েছে নামিয়ে নেওয়ার।

এই পর্যায়ে মিশিয়ে দেওয়া হতো সামান্য বেকিং সোডা, যা নুনমিঠাইয়ের ভেতরকার ফাঁপা গঠন তৈরি করত। সঙ্গে সঙ্গে মিশ্রণটি ফুলে উঠত, তৈরি হতো ফেনার মতো টেক্সচার। এরপর দ্রুত সেটি ঢালা হতো আগে থেকে প্রস্তুত করা টিনের ফ্রেমে।

ফ্রেমে ঢালার পর কাঠি বা ছুরি দিয়ে সমান করে দেওয়া হতো মিশ্রণটি। ঠান্ডা হতে শুরু করলে সেটি শক্ত হয়ে যেত কুড়মুড়ে এক মিষ্টিতে পরিণত হয়ে। ঠান্ডা হলে ছুরি দিয়ে কেটে নেওয়া হতো চৌকো, আয়তাকার বা আড়াআড়ি টুকরো আকারে। প্রতিটি টুকরোর ভেতরে দেখা যেত হালকা ফাঁপা গঠন, যা এটিকে কুড়মুড়ে ও আকর্ষণীয় করে তুলত।

এইভাবেই তৈরি হতো নুনমিঠাই—যা শহরের কটকটির তুলনায় ছিল অনেক বেশি ঘরোয়া, স্বাদে বৈচিত্র্যময় এবং মানুষের হাতে তৈরি ঐতিহ্যের প্রতীক।

নুনমিঠাই—রাজ্যজয়ী আনন্দের স্মৃতিকথা
আব্দুর রহিম। স্মৃতি হাতরে ৪০ বছর আগের ঘটনা বললেন (পুনঃলেখন)। “সেদিন সকালে নুনমিঠাইওয়ালার ডাক শুনে দৌড় দিলাম। মা বললেন, ঘরে কিছু নাই, আরেকদিন নিস। কিন্তু মন মানে না। ঘরের কোণে পড়ে থাকা একটা ভাঙা ছোট পাতিল চোখে পড়ল। সেটাই নিয়ে ছুটলাম। বিক্রেতা হাসতে হাসতে বলল, এই পাতিল দিয়া এক টুকরাই হবে। আমার আপত্তি নাই। একইটুকুই আমার যথেষ্ট। নুনমিঠাই পেয়ে আমি যেন রাজা! বন্ধুদের দেখাতে দেখাতে অর্ধেক খেয়ে ফেললাম। মুখে মিষ্টি, মনে আরও মিষ্টি। সেই দিনটা দারুণ ছিল।”

জাহাঙ্গীর আলম। নুনমিঠাই খেতে ঘরের বেড়া থেকে টিন খুলে নেওয়ার গল্প জানালেন (পুনঃলেখন)। “মা-বাবা ঘরে ছিলেন না। আমি শুনলাম নুনমিঠাইওয়ালার ঘন্টি বাজানো। এদিক-ওদিক তাকালাম। কিছুই পেলাম না। হঠাৎ চোখে পড়লো ঘরের কোণায় বেড়ার এক এক টুকরা টিন নড়বড়ে হয়ে আছে। আমাকে আর পায় কে! একটানে খুলে দৌড়…। যেই না নুনমিঠাই হাতে পেলাম, পেছন থেকে মা এসে কান ধরল—তুই বেড়ার টিন খুলছিস! আমি কেঁদে ফেললাম ভয় পেয়ে; কিন্তু মা যখন আমার মুখে মিষ্টির টুকরোটা দেখলেন, নিজেও হেসে ফেললেন। বললেন, চল, এবার একটুকরো আমাকে দে! তবে বেড়া ভাঙা ঠিক হয়নি জানিয়ে বললেন, তোর বাবা জানলে বকবে। এমন আর কখনোই করবি না।”

নূরজাহানের শেষবারের মতো নুনমিঠাই খাওয়ার স্মৃতিটা একটু ভিন্ন (পুনঃলেখন)। “একদিন বিকালে উঠানে বসে অনেকের সাথে গল্প করছিলাম। তাও বছর বিশেক হবে। হঠাৎ শুনলাম রাস্তায় একটা মানুষ ঘন্টি বাজিয়ে ডাক দিচ্ছে—নুনমিডাই রাকবাইন! অনেক বছর পর এমন ডাক শুনে অবাক হলাম। দৌড়ে গেলাম, দেখি বয়স্ক লোকটা। বলল, এখন আর কেউ নেয় না, একদিন ছিল অনেক চাহিদা। আমি টিন কিংবা অন্য পুরান কিছু না খুঁজে উনাকে অনেক বলে-কয়ে টাকা দিয়ে কিছুটা কিনলাম। খেতে খেতে মনে হচ্ছিল, যেন ছোটবেলায় ফিরে গেছি। সেই কাঁচা রাস্তা, বন্ধুরা, আর মিষ্টির গন্ধ—সব চোখের সামনে ভেসে উঠল। শেষবারের মতো নুনমিঠাই খাওয়ার সময়টা তাই হয়ে গেল আমার এক জীবনের স্মৃতি।”

আলাপচারিতায় বিক্রেতার স্মৃতিকথা
মোকছেদ আলী। এক সময় গ্রামের পর গ্রাম হেঁটে বেড়ানো মানুষটি আজ বয়সের ভারে ন্যূব্জ। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগরে। সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হলে তাঁর সাথে আলাপচারিতায় উঠে আছে সেইসব দিনের স্মৃতি (পুনঃলেখন করা হয়েছে)।

“আমি তখন তরুণ। ভোরে ঘুম ভাঙত মুরগির ডাকেই। বাঁশের ভারে নুনমিঠাইয়ের ফ্রেম সাজিয়ে কাঁধে তুলে নিতাম। এক হাক দিতাম—নুনমিঠাই রাখবেন। হাতে বাজাতাম ঘন্টি। তখনকার দিনে এক গ্রামের পর আরেক গ্রাম পায়ে হেঁটে যেতাম। দুই মাইল, তিন মাইল পথ। শিশুরা দৌড়ে আসত ভাঙা পাতিল বা মরিচাধরা টিন নিয়ে। বিনিময়ে দিতাম টুকরো টুকরো নুনমিঠাই। শিশুরা পেলে যেমন খুশি, আমিও তেমন উচ্ছ্বসিত হতাম। ওদের মুখের হাসিই ছিল আমার আসল উপার্জন। এখন সেই দিন নাই—রাস্তা পাকা, মানুষ ব্যস্ত, আর আমি শুধু স্মৃতির ভেতর হাঁটি। মাঝে মাঝে সেই হাঁকটা এখনো কানে বাজে—নুনমিঠাই রাখবেন!

গ্রামে গ্রামে নুনমিঠাই বিক্রি করা আমার কাছে শুধু ব্যবসা ছিল না—ছিল এক রাজ্যের আনন্দ, একরাশ ভালোবাসা। ভোরে ঘন্টি বাজিয়ে রাস্তায় হাঁক দিতাম, ‘নুনমিডাই রাকবাইন, নুনমিডাই!’—এই ডাক উঠতেই চারদিক থেকে ছুটে আসত শিশু-কিশোররা। যখন ওদের হাতে এক টুকরো নুনমিঠাই তুলে দিতাম, চোখে মুখে যে হাসি ফুটে উঠত—সেই হাসিই ছিল আমার আসল মুনাফা।

এই দৃশ্যটাই আমাকে ধরে রেখেছে এই পেশায় যুগের পর যুগ। হয়তো এই বছরগুলো সরাসরি সব শিশুর হাসি-আনন্দ চোখে দেখিনি; কিন্তু অজান্তেই আমার মনের আয়নায় খেলে যেতো হাজারো সেই নির্মল চেহারা। কতবার ভেবেছি, বয়স হয়েছে, এবার থামি—কিন্তু পারিনি। মনে হতো, ওইসব ছোট্ট মুখগুলো যেন এখনো আমার ডাকের অপেক্ষায় আছে। তাই আবারও কাঁধে ভার তুলে বেরিয়ে পড়তাম গ্রামের পথে।

তবে সময় এখন অনেক বদলে গেছে। আমিও বুড়িয়ে গেছি। বয়সের ভারে বোঝা বহন আমার আর হয়ে ওঠে না। ফেরি করে নুনমিঠাই বিক্রি করার সেই দিনও শেষ। এখন মানুষ দোকান থেকে কিনে খায় প্যাকেটজাত বাহারি খাবার। শহরের বড় বড় ব্যবসায়ী, ব্র্যান্ডের দোকান—সব দখল করে নিয়েছে বাজার। গ্রামীণ নুনমিঠাই বা মিষ্টান্নের জায়গা সরে গেছে চকচকে মোড়কের ভেতর।

আমাদের পরে এই পুরনো পেশার উত্তরাধিকারীরা আর কেউ এই পথে হাঁটেনি। বাপ-দাদার দেখানো পথ ধরে ব্যবসা করে আমি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছি, তারা এখন চাকরি করে, ভালোই আছে; কিন্তু আমি পারিনি এই কাজটা ছাড়তে। এই মিঠাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জীবন, আমার শৈশব, আমার স্মৃতি।

এখন মাঝে মাঝে ঢাকার কিছু উদ্যোক্তা এসে বলেন, ‘চাচা, আমাদের জন্য নুনমিঠাই বানিয়ে দিন।’ যতটা পারি বানিয়ে দিই। শুনেছি, তারা নাকি অনলাইনে বিক্রি করে—চমৎকার ছবি তুলে, দারুন বিজ্ঞাপন দিয়ে। দামও নেয় অনেক। কিন্তু আমরা যারা বানাই, তাদের ভাগে আসে সামান্য লাভ। তবুও শান্তি লাগে, মনে হয়—আমাদের বানানো নুনমিঠাই এখনো মানুষের মনে বেঁচে আছে। যতদিন পারি, ততদিন এই কাজ করেই যেতে চাই।”

গ্রামীণ জীবনে বিলুপ্তির পথে এক মিষ্টি ঐতিহ্য
আজ আর দেখা মেলে না সেই নুনমিঠাই বিক্রেতাদের, যারা একসময় ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের পথে হাঁক দিতেন—“নুনমিডাই রাকবাইন, নুনমিডাই!” সময়ের স্রোতে তারা একে একে হারিয়ে গেছেন। প্রযুক্তির অগ্রগতি, ভোক্তা সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং বাজারের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবারটিও।

যে নুনমিঠাই একসময় ছিল গ্রামের শিশু-কিশোরদের আনন্দের উপলক্ষ, সেটি এখন স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ। দোকানে এসেছে চকচকে প্যাকেটে মোড়ানো চকলেট, বিস্কুট, ক্যান্ডি, চিপস—যেগুলো রঙে, ঘ্রাণে ও প্রচারণায় সহজেই দখল করে নিয়েছে শিশুদের পছন্দের জায়গা। ফলে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টিজাতীয় খাবারটির চাহিদা কমে গেছে নাটকীয়ভাবে।

একসময় যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ফেরিওয়ালা এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে এখন অন্য পথে। কেউ হয়েছেন সবজি বিক্রেতা, কেউ নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ী, কেউবা শহরমুখী শ্রমিক। যাঁরা এখনো টিকে আছেন, তারাও খুঁজে নিচ্ছেন আধুনিক উপায়ে বিক্রির পথ—কেউ স্থানীয় হাটে সীমিত পরিসরে বানাচ্ছেন পুরনো দিনের সেই মিষ্টি।

পুরনো দিনের মতো গ্রামীণ জীবনের অলিতে-গলিতে ভেসে আসে না সেই হাঁক, দেখা যায় না কাঁধে ভার বয়ে চলা ফেরিওয়ালাদের পদচারণা। সময়ের বিবর্তনে নুনমিঠাই শুধু হারিয়ে যাওয়া এক খাদ্য নয়—এটি হারানো গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি, যা আজও নস্টালজিয়ার মতো ভেসে বেড়ায় আমাদের মনে।

আধুনিক বাজারে নুনমিঠাই
ভাঙা লোহা-লক্কর, পুরনো হাড়ি-পাতিল বা মরিচা ধরা টিনের টুকরোর বিনিময়ে নুনমিঠাই বিক্রির সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না গ্রামবাংলার কোথাও। সময়ের আবর্তে হারিয়ে গেছে সেই বিনিময়প্রথা, বদলে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের ভোক্তা সংস্কৃতি।

বর্তমানে নুনমিঠাই বা কটকটি পাওয়া যায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে—দেশজুড়ে গড়ে ওঠা নানা উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উদ্যোগের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে। অনেকে পুরনো ঐতিহ্যের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় কারিগরদের দিয়ে বানিয়ে বিক্রি করছেন “হাতের তৈরি কটকটি” নামে। তবে দাম এখন অনেক বেশি। একসময় যেটি পাওয়া যেত ভাঙা অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের টুকরোর বিনিময়ে, আজ সেই একই নুনমিঠাই কিনতে লাগে শত শত টাকা। কোথাও এক কেজির দাম ৬০০ টাকা, আবার কোথাও তা ছাড়িয়ে যায় ১০০০ টাকারও বেশি।

কিশোরগঞ্জের গ্রামীণ জীবনে “নুনমিঠাই” নামে পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিজাতীয় খাবার সারা দেশে “কটকটি” নামেই পরিচিত। অনলাইনেও এ নামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে নাম বদলালেও এর স্বাদ, গন্ধ আর স্মৃতির জায়গা বদলায়নি।

যে মিষ্টির টুকরো একদিন শিশুদের হাসির কারণ হতো, আজ তা হয়ে উঠেছে স্মৃতির প্রতীক—এক হারানো শৈশবের নিদর্শন। সময়, প্রযুক্তি ও বাজারের হিসাব পাল্টে দিয়েছে এর মূল্য; কিন্তু মানুষের হৃদয়ে নুনমিঠাই এখনো রয়ে গেছে সেই সরল জীবনের মিষ্টি স্মারক হয়ে—এক টুকরো মিষ্টিতে লুকিয়ে থাকা নিষ্পাপ আনন্দের গল্প হয়ে।

লেখক: সংবাদমাধ্যম কর্মী

Similar Posts

error: Content is protected !!