‘বিদ্রোহী’র আলোকে নজরুল মানস

kazi nazrul islam

মহিবুর রহিম ।।
বাংলা সাহিত্যে যুগোত্তীর্ণ কবিতাগুলোর অন্যতম কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। জনপ্রিয়তার দিক থেকে এ কবিতার সঙ্গে তুল্য খুব কম কবিতা বাংলা সাহিত্যে পাওয়া যাবে। রবীন্দ্র সাহিত্যের স্বর্ণযুগে নজরুলকে স্বতন্ত্র যুগস্রষ্টা কবির মর্যাদা এনে দিয়েছে এই কবিতা। ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে কবিতাটি প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায়। প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই কবিতাটি নিয়ে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। শুরুতেই কবিতাটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গ্রন্থভুক্ত হওয়ার পূর্বেই সমগ্র বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে যায় এ কবিতা। নজরুল হয়ে উঠেন সমকালের একজন জনপ্রিয় কবি। অনেক অভিজ্ঞ কবিদের দৃষ্টি পড়ে নজরুলের প্রতি। বহুলভাবে অভিনন্দিত এবং বিতর্কিতও হন কবি। যেমনটি এর পূর্বে কমই দেখা যায় না। সাহিত্যের আসরে স্থায়ী আসন নিতে অনেক কবিকেই দীর্ঘকাল সাধনা করতে হয়েছে। নজরুল সেই আসনটি অধিকার করেছেন অতি অল্পকালের মধ্যে। এটি হয়তো নজরুল জীবনের বহু বিস্ময়ের একটি মাত্র দিক। আমরা দেখি বাংলা সাহিত্যে ছাপার হরফে নজরুলের আত্মপ্রকাশ ১৯১৯ সালে। তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় (শ্রাবণ-১৩২৬)। সাহিত্যে আগমনের মাত্র তিন চার বছরের মধ্যেই নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন বইয়ে দেন। এই আলোড়ন কোন সাময়িক পরিতৃপ্তির নয়, যা অনেকেই ধারণা করেছিলেন। কেননা যতদিন গিয়েছে নজরুলের জনপ্রিয়তা, স্বকীয়তার পূর্ণতা সকলকেই কেবল বিস্মিত করেছে। আজও সেই বিস্ময়ের শেষ হয়নি। নজরুলের জনপ্রিয়তারও কোন কমতি ঘটেনি। চির স্বাধীনচেতা বাঙালির জাতীয় কবি কাজী নজরুলের এই হচ্ছে বিশেষত্ব!

নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনা করেন ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই কবিতাটি রচনারও আলাদা একটি প্রেক্ষাপট আছে। সাহিত্য জগতে পদার্পণ করেই নজরুল বুঝতে পারেন পরাধীনতার গ্লানি কতটা ভয়ঙ্কর করে তুলেছে সাহিত্যের অঙ্গনকে। সেই রুদ্ধশ্বাস অবস্থা হতে নজরুলের বেরিয়ে আসাটা সহজ ছিল না। নজরুলের ব্যক্তি জীবনকেও নানা পারিপার্শ্বিকতা, প্রতিবন্ধকতা দুর্বিসহ করে তুলেছিল। সেই  অবস্থায়ই নজরুল কুমিল্লায় আসেন ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে। কিছু দিনের জন্যে অবস্থান করেন কুমিল্লার সন্নিকটস্থ দৌলতপুরে। সেখানেই পরিচয় এবং আকদ হয় সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস আসার বেগমের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের রাতেই নজরুল দৌলতপুর ত্যাগ করেন যা নজরুল নার্গিস জীবনের এক করুণ ট্র্যাজেডি। নজরুল চলে আসেন কলকতায়। অনুভব করেন জীবনের কঠিন থেকে কঠিনতরো চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তি জীবন এবং জাতীয় জীবনকে কবি এক রুদ্ধশ্বাস বাস্তবতার মধ্যে অবলোকন করেন। এই সময়কালেই কবি রচনা করেন তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। বাস্তবতার দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসার এক দ্রোহী অনুভব ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় এই কবিতায়। এরই সঙ্গে যুক্ত হয় পরাধীন জাতির স্বাধীনতার স্পৃহা। ব্যক্তিসত্ত্বার জাগরণের মধ্যে অকুণ্ঠ অনুভবের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, যা পূর্বেকার গীতি প্রবণতার কবিতাগুলোতে লক্ষ্য করা যায় না। শুধু আত্মজাগরণের অনুভবই বিদ্রোহী কবিতার মূলসুর নয়। প্রথাগত আত্মজাগরণের ভাবোচ্ছ্বাস থেকে বেরিয়ে আসাই যেন এই কবিতার মূলবার্তা। ব্যক্তিগত অনুভবের পরিতৃপ্তি নয়, সামগ্রিক এক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় আন্দোলিত দ্রোহী চেতনার স্ফুরণ ঘটেছে এ কবিতায়। একটা, গোটা জাতির অবদমিত বিপন্নপ্রায় সত্তা যেন নড়ে উঠেছে বিদ্রোহী কবিতার তরঙ্গায়িত প্রতিটি পংক্তিতে। আছে মিথ ও ঐতিহ্যের অসাম্প্রদায়িক ব্যবহার। বহুমুখী বিস্ময় আছে এ কবিতার গঠন শৈলীতেও। আদেশাত্মক বাক্যের পুনঃব্যবহারের মধ্যে এই আত্ম-উপলব্দি নজরুলের পূর্বে এভাবে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
kazi nazrul islam
“বল বীর
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!”
বাংলা কবিতায় এরই মধ্যে গীতিধর্মীতার পূর্ণবিকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর অনুগামীদের হাতে বাংলা সাহিত্যের আসাধারণ সাফল্য সূচিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের এমন অনেক সাফল্যের মধ্যেও নজরুলের বিদ্রোহী চেতনাটি এতটা ঔজ্জ্বল্যে আর অন্যত্র পরিদৃষ্ট হয় না। প্রথম দিকে নজরুলের সমালোচকেরা এ কবিতারটির মূল প্রণোদনা অসংলগ্ন ভাবোচ্ছ্বাস বলে ধারণা করে ছিলেন। কিন্তু তাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। কেননা এ কবিতার মধ্যে এক নতুন যুগের বারতা ঘোষিত হয়েছে। অবদমিত ব্যক্তিসত্ত্বার প্রকাশ, স্বাধীনতার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পরাধীন জাতির চেতনাগত অচলায়তন ভেঙে দেয়া, নতুনের আগমন ঘোষণা সর্বোপরি চিরঞ্জীব ব্যক্তিসত্তার উলঙ্গ প্রকাশে একটি অনন্য নির্দশনা এ কবিতাকে প্রাণ দিয়েছে। সুতরাং বিদ্রোহী কবিতাটিকে যারা কবির সাময়িক ভাবোচ্ছাস বলে ভেবে ছিলেন, অচিরেই তাদের ভুল ভেঙ্গে যায়। তারা দেখতে পান শুধু পঠনসৌকর্যের কারণেই নয়, অসাধারণ বাণী-ভঙ্গিও কবিতাটিকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তুলেছে। যেমন-
* উঠিয়াছি চির-বিষ্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর।
* আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম-কানুন, শৃঙ্খল!
আমি মানি নাকো কোন আইন,
* আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
* মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য।
* আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।
* আমি বিশ্ব-তোড়নে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
* আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি।
* মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-
* আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ চিহ্ন,

একটি পরাধীন জাতির অব্যক্ত বেদনার প্রতিধ্বনি আছে প্রতিটি পংক্তির মর্মকথায়। আছে আরও অনেক কিছু একটি শিল্পসফল কবিতার মধ্যে যা সঙ্গোপনে থেকে যায়-যা পাঠকের অন্তরে ছড়ায় শিল্পের রস। শুধু পাঠে নয় অনুধাবনে যা ইশারা করে, আন্দোলিত করে। বিদ্রোহী কবিতার যাদুকরী সাফল্য এখানেই।

‘পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে’,
সমালোচকদের তীর্যক বাক্যবানে জর্জরিত নজরুলও মনে হয় সংশয়িত হয়েছেন। কিন্তু যুগের হুজুগ কেটে গিয়ে এখন নজরুলের নির্মোহ মূল্যায়ন অসম্ভব নয়। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি উপনিবেশবাদের রোপিত বিষ উগড়ে নেয়া নীলকণ্ঠ কবির জাতি চেতনার অসাধারণ স্ফুরণ এই বিদ্রোহী কবিতা। হিন্দু-মুসলমান বিভেদের বীজ রোপনের মাধ্যমে উপনিবেশবাদ ও তাদের দেশীয় সুবিধাভোগী শ্রেণী যে চিন্তা সাম্রাজ্যের মায়াজাল ছড়িয়ে জাতিকে আরও অধিকতর বিভক্ত করে নির্বিঘ্নে শোষণ-পীড়ন সম্ভব করে তুলেছিল- তার প্রধান শিখণ্ডি বানিয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে। যা ক্রমেই পরাধীনতাকে দীর্ঘায়িত করে চলেছে। জাতির ঐক্যের পথে তুলে দিয়েছে বিষাক্ত কণ্টকরাজি। তারই দংশনে জর্জরিত ব্যক্তি ও সমাজসত্ত্বা। এরই ফলশ্রুতি জাতিসত্ত্বাকে বিভক্ত করে স্বাধীনতাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব আঘাত করে সেই নতজানু তাবেদার মানসিকতার মর্মমূলে। উপনিবেশবাদ রোপিত বিষাক্ত চিন্তামায়াজালে। সে কারণেই কবিতাটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ তারুণ্যের জয়ধ্বনিতে পরিণত হয়।
kazi nazrul islam
বিদ্রোহী কবিতাটি নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২) কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। ‘অগ্নিবীণা’ হয়ে উঠে বাংলা সাহিত্যের সেরা জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। নজরুল পরিণত হন যুগের এক মহানায়কে। কিন্তু কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর জন্যে সেটা সহনীয় ছিল না। এ সময়ে দুটি কবিতার প্রকাশনার দায়ে নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং কুমিল্লা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। স্বাধীনতা ও স্বাধীন চেতনার স্বপক্ষে এটিই কোন বাঙালি কবির প্রথম কারাবরণ। ১৯২৩ সালে জানুয়ারি মাসে বৃটিশ আদালত নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে। নজরুল ছাড়া পান ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। ততোদিনে তিনি গোটা জাতির স্বাধীনসত্ত্বার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তবু সব কিছুর মধ্যেই নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বলিষ্ঠ প্রত্যয়টি বিভিন্ন মাত্রায় বিকশিত হতে থাকে। ‘অগ্নিবীণা’ পর্যালোচনা করলে এই সারসত্যটি আরও প্রবলভাবে ধরা পড়ে। ‘অগ্নিবীণা’ যেন স্বাধীনতা প্রত্যাশার মন্ত্র দিয়ে ঠাসা। কোন ঘুম পারানিয়া সুরে রচিত নয় এ গ্রন্থের কোন কবিতা। নজরুল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন স্বাধীনতা এবং মুক্তি জাতির জন্যে অপরিহার্য। তারই প্রয়োজনে তিনি হাজির করেছেন নতুন জীবন দর্শন ‘প্রলয় নতুন সৃজন বেদন’। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন-
‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নতুন সৃজন বেদন!
আসছে নবীন-জীবন হারা অসুন্দরে করতে ছেদন!’

একটি অনিবার্য ধ্বংসযজ্ঞ বইয়ে দিয়ে নতুনের আগমনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়া, নজরুলই প্রথম এই জীবন দর্শন সাহিত্যে নিয়ে আসেন। শুধু সুন্দরের তপস্যাই সাহিত্য নয়, নজরুল যেন সে কথাকেই উচ্চকিত করে তুললেন। কেন তিনি এমনটি করলেন? কারণ তিনি যুগের ভাষা বুঝতে পারছেন। পরিবর্তন আসন্ন, সে পরিবর্তন মুক্তির নতুন চেতনায় জাগ্রত মানুষের সম্মিলিত এক অদম্য আকাঙ্খা। নজরুল তাকেই আবাহন করলেন হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের, পুরাণ চেতনার সমস্ত উদাহরণ ছেঁকে তিনি দেখালেন মানব মুক্তি যদি নিশ্চিত না হয়, সব কিছুই নিরর্থক। সেই নিরর্থক জগদ্দল পাথর যুগের প্রয়োজনেই সরিয়ে ফেলতে হবে। মানবমুক্তি ছাড়া ধর্ম নিরর্থক, সমাজ সংস্কৃতি নিরর্থক, রাষ্ট্র নিরর্থক। নজরুল পরাধীন জাতির রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি ভেঙ্গে দিতে চান। তাই তিনি লিখেছেন-
‘বিশ্বগ্রাসীর ত্রাস নাশি আজ আসবে কে বীর এসো
ঝুট শাসনে করতে শাসন, শ্বাস যদি হয় শেষও!
-কে আছ বীর এসো
‘বন্দী থাকা হীন অপমান’- হাকবে যে বীর তরুণ
শির-দাড়া যার শক্ত তাজা, রক্ত যাহার অরুণ
সত্যমুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের
খোদার রাহায় জান দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের।’

নজরুলের আহবান খুবই সুস্পষ্ট লক্ষ্যে অবিচল। ‘সত্য মুক্তি স্বাধীন জীবন’ এই পদ্য পংক্তিতে তার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে। কেননা বিংশ শতকের বিশের দশকের বাংলা সাহিত্য পর্যালোচনা করলে এটি খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠে। সাহিত্য সংস্কৃতি জাতিকে একটি দ্ব্যর্থহীন লক্ষ্যে পরিচালিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। নজরুল সেখান থেকেই কাজ শুরু করলেন। ঐক্য এবং সংগ্রাম এই যুগপৎ ধারণায় তিনি তারুণ্যকে উদ্বুদ্ধ করলেন। নজরুল লিখলেন-
‘সত্য কে আজ হত্যা করে অত্যাচারীর খাড়ায়,
নেই  কি রে কেউ সত্য সাধক বুক ফুলে আজ দাড়ায়।’

যুগের প্রয়োজনেই নজরুল লিখলেন। কিন্তু নিজের সত্ত্বার রক্ত-রস ঢেলে তাকে দিলেন চিরন্তনের রূপ। সুতরাং সাহিত্যে তার আবেদন হয়ে উঠল সুদূর প্রসারি। সমালোচকগণ বাংলা সাহিত্যে নজরুলের এই সংগ্রামী আগমন কে একটা ঝড়ো তাণ্ডবের সঙ্গে তুলনা করেন। আবার কখনো বলেন মূলত সে বিদ্রোহী। কিন্তু বিদ্রোহী কবিতার আকাশচুম্বি আলোড়ন কিংবা প্রথা বিরোধী বিদ্রোহী অভিব্যক্তিই তা প্রমাণ করে না। বরং নজরুল সাহিত্য পাঠে আরও ব্যাপক তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়-সাহিত্যের একটা নতুন যুগ যিনি একাই গড়ে নিয়েছেন। তিনি জাতিকে নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করলেন। হিন্দু-মুসলিম চেতনাকে নতুন বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেই তার শুরু। ‘বিদ্রোহী’তেই তার একটা সংহত রূপ দিয়েছেন। জাতির এই সাহসী সম্মিলন দীর্ঘকাল ধরে অসম্ভব বলেই পরিগণিত হচ্ছিল। ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোর জঠরে বেড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িকতার বিষ-বাষ্পে তখন মুক্ত চেতনার রুদ্ধশ্বাস অবস্থা। সেখানে বসেই নজরুল নতুন মিথ তৈরি করলেন-
* আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা- বারিধির।
* আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি
* আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস
* আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার
* আমি চক্র ও মহাশঙ্ক, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড।
* তাজি বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মৎ হ্রেষা হেঁকে চলে।

এমনই বহু ঐতিহ্যের, পৌরাণিক উদাহরণের অসাধারণ সমন্বয়, বাংলা কবিতায় এরপূর্বে এমনভাবে দৃষ্ট হয়? নিশ্চিত করেই বলা যায়-এই সাহসের সড়কটি নজরুল একাই নির্মাণ করেছেন। ভাঙ্গা এবং গড়ার মন্ত্র তিনি এক সঙ্গে চালিত করলেন। এর একটি আলাদা আস্বাদ আছে। তিনি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্পষ্ট করে তুললেন। জাতির ভাগ্য বিধাতার আসন অধিকার করে থাকা ভগবানের বুকে পদ চিহ্ন এঁকে দেন। এ ভগবান নিশ্চিতই বৃটিশ শাসক-কিন্তু নজরুল একটি রূপকের আশ্রয়ে লিখলেন সে কথা। পুরাণের ভৃগু হচ্ছে সেই রূপক। সুতরাং নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ ক্ষণকালের ভাবোচ্ছ্বাস নয়- এটি খুবই স্পষ্ট।

এক অর্থে ‘বিদ্রোহী’কে নজরুল সাহিত্যের ‘মুখবন্ধ’ও বলা যায়। এ কবিতাতে তিনি লিখেছেন ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণ-তূর্য’ নজরুলের সামগ্রিক সাহিত্যে এই দুটি ভাবেরই পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে। প্রেম এবং দ্রোহ এক সঙ্গে আশ্চর্য ঐকতানে মিলিত হয়েছে নজরুল সাহিত্যে। আবার এ দুটি ভাব নিরর্থক ভাবের আসন নিয়ে বসে নেই। নজরুলের দ্রোহ নিরর্থক দ্রোহ নয়। মানবমুক্তি, জাতিমুক্তি সত্য সাধনার অবারিত উৎসারণ এসবই নজরুল  সাহিত্যে দ্রোহের অনিবার্য নিয়ামক। যখন সত্যকে ধ্বংস করা হয় অত্যাচারীর খাড়ায়। যখন ‘আজাদ মানুষ বন্দী করে অধীন করে স্বাধীন দেশ’ কিংবা ‘ইসলামও ডুবে গেল, মুক্ত স্বদেশও নাই” তখন স্বাভাবিক কারণেই সত্য সাধক বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায়। এখানেই নজরুলের বিদ্রোহীসত্ত্বার উলঙ্গ প্রকাশ। সুতরাং নজরুলের বিদ্রোহের বহুমাত্রিক তাৎপর্য আছে। প্রথাগত যে অচলায়তন যার কুর্ণিশ করা নজরুলের পক্ষে সম্ভব নয়, সেখানেই নজরুলের বিদ্রোহ।
‘চিতার উপরে চিতা সারি সারি
চারি পাশে তারি
ডাকে কুক্কুর গৃধিনী শৃগাল
প্রলয় দোলায় দুলিছে ত্রিকাল”
(আগামনী/অগ্নিবীণা)

জাতির সে দুর্দিনে যখন প্রলয়ের পদধ্বনি বেজে উঠেছে, যে ‘প্রলয় ভেঙ্গে আবার গড়তে জানে’ যে প্রলয় যুগের অনিবার্য নিয়তি তাকেই প্রাণ দিলেন নজরুল।
‘ঐ সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িৎ চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্রগানে ঝড়-তুফানে।’
(প্রলয়োল্লাস/অগ্নিবীণা)
‘মেঘলা ছিড়িয়া চাবুক কর মা,
সে চাবুক কর নব তড়িৎ,
জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে
লালে লাল হোক শ্বেত হরিৎ।’
(রক্তাম্বরধারিনী মা/অগ্নিবীণা)
‘মহা সিংহাসনে সে কাঁপিছে বিশ্ব-সম্রাট নিরবধি।
তার-ললাটে তপ্ত অভিশাপ-ছাপ এঁকে দিই আমি যদি!
তাই টিটকিরি দিয়ে মহা হেসে উঠি
সে হাসি গুমরি লুটায়ে পড়ে রে-
তুফান ঝঞ্ঝা সাইক্লোন টুটি!’
(ধূমকেতু/অগ্নিবীণা)

নজরুল স্পষ্ট করেই জানতেন উপনিবেশবাদের জঠরে বর্ধিত সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আছে। সে ক্ষমতার বন্দনা চলছে চারপাশে। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিপাগল মানুষ অত্যাচারী শাসকের ক্ষমতা পরিমাপ করে কাজ করে না। বরং আত্মশক্তির উপর নির্ভর করে অপরিণামদর্শী সাহসে এগিয়ে চলে। নজরুলের স্বভাব বিদ্রোহের এই হচ্ছে স্পর্ধা।
‘ভগবানে আমি পোড়াব বলিয়া জ্বালিয়াছি বুকে চিতা!’

নজরুলের কাব্যচেতনায় প্রেমও তাঁর বিদ্রোহী চেতনার মতোই স্বতন্ত্র ভাবধর্মী। তাঁর প্রেমের মধ্যে আলাদা উচ্ছ্বাস আছে, আছে অনমনীয় গতি। চিরায়ত প্রেমের বন্দনা তিনি রচনা করেননি। কিংবা প্রেমের মধ্যে অধ্যাত্ম অনুভবের সন্ধানও তিনি করেননি। নির্জলা রক্ত-মাংসের প্রেম, যা ইন্দ্রিয়জাত আকাঙ্ক্ষা থেকেই উদ্ভূত। নজরুলের সেই প্রেমভাবের স্ফুরণও বিদ্রোহী কবিতাতেই।
* আমি কভু প্রশান্ত
* আমি ষোড়শীর হৃদি- সরসিজ প্রেম উদ্দাম
* আমি গোপন মেয়ের ভালবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্!
* আমি  পথিক কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া
* আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর।
* চিত-চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর থর থর প্রথম পরশ কুমারীর!

প্রেম অনুভূতির সঙ্গে তার সম্পর্কের আভাস ক্রমেই এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কৈশোর ও যৌবন ভারাক্রান্ত মানব প্রেম যে অনুভূতি জাগায় এখানে তারই আভাস। কিন্তু নজরুল সাহিত্যে প্রেম একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তি মানুষেরই আচরণ। তাই তার আলাদা প্রেক্ষিত আছে, কার্যকারণ আছে। যেমন-
* আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষজ্বালা,
প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতিফের!
আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
* আমি আকুল নিদাঘ তিয়াসা

নজরুলের অনুভূতির মধ্যে বঞ্চিতের সঙ্গে একটা অচ্ছেদ্য সম্পর্ক এবং এরই ফলশ্রতিতে দ্রোহের উদ্ভব। এভাবেই বিন্যস্ত হয়েছে নজরুল সাহিত্যের ভাবাদর্শ। তবে এর মধ্যেই পরিণতি টানেননি কবি। পরিণতি রচিত হয়েছে মানব মুক্তির আহবানের মধ্যে। শুধু বিদ্রোহ, শুধু প্রেম বিরহ নয়- সব কিছুরই শেষকথা মানব মুক্তি, শোষণ বঞ্চনার অবসান, স্বাধীনতা।
‘যুগ যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান!
ফেনাইয়া ওঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।’

নজরুলের এই অকুন্ঠ মানব মুক্তির আহবান বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সংযোজন। পরাধীন জাতির তিমিরাচ্ছন্ন ভাগ্যাকাশে যেন একটা দীপ্ত সূর্য। নজরুলের আগমনের মাধ্যমে গোটা জাতি যেন খুঁজে পায় পথের দিশা। নজরুলের সাহিত্য সম্পর্কে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী যথার্থই লিখেছেন- “নজরুল ইসলাম আমাদের আধুনিক কাব্য সাহিত্যের একটা অপূর্ব স্থান অধিকার করেছেন। বস্তুত তাঁর সিদ্ধি সামান্য নয়। তিনি বাংলা ভাষার চেহারা বদলে দিয়েছেন। নির্বাক অবসাদ মুমূর্ষূতার জায়গায় প্রাণময়ী বাণী, জাগিয়ে তুলেছেন। এমন একটা রচনা রীতি প্রবর্তন করেছেন যা যুগপৎ প্রাণ সমৃদ্ধ সরলতা ও আনন্দময় মহত্বে পরিপূর্ণ। তার আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত কাব্য-সুন্দরী যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ধূলি মলিন পথের বহু উর্ধ্বে নীল আকাশে বিচরণ করতেন এবং সেখান থেকেই সাধকের অর্ঘ্য নিবেদন গ্রহণ করতেন, কিন্তু আমাদের এই তরুণ কবি তাকে খুঁজেছেন এই পৃথিবীর মাটিতেই এবং সঙ্গিনীরূপে লাভও করেছেন। যেমন আমরা সাধারণ মানুষেরা হাসি, কাঁদি, বিদ্রোহ করি এবং পূর্নবার চুম্বনাভিলাষে মুখ নোয়াই, তেমনি তাঁর এই সহচরী ও হাসেন, কাঁদেন, বিদ্রোহিনী বেশে দেখা দেন। কিন্তু আবার প্রেম-প্রীতির স্নিগ্ধ মহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠেন।”

নজরুলের আগমনকে গোটা বাঙালি জাতি নজির বিহীন ভাবেই অভিনন্দিত করে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও বাদ যান না। তিনি লেখেন-
‘আয় ছুটে আয় রে ধূমকেতু
আধাঁরে বাধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনের এই দুর্গ শিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন’ কিংবা
‘ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ ওরে আমার কাঁচা
আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’

কার্যত নজরুল একটি নতুন যুগের ভিত্ তৈরি করে দেন। বাস্তববাদ আর মানব মুল্যবোধ যার প্রধান প্রেরণা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ছড়ানো গোলক ধাঁধাঁয় তিনি পা দেননি। অলস ভোগের উপকরণ হিসেবে সাহিত্যকে দেখেননি। সম্ভবত সে কারনেই নজরুল লিখতে পেরেছেন-
‘গাহি সাম্যের গান
সেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
কিংবা
‘গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

বিদ্রোহীতে মানব মুক্তির যে আশাবাদ ব্যক্ত করে ছিলেন, অগ্নিবীণাতে তার সবিশেষ বিস্তার ঘটে।  দুই দশকের সাহিত্য জীবনে তারই পূর্ণতা তিনি দিয়েছেন। সাম্যবাদী’র মতো অসাধারণ কবিতায় তিনি যেন মানব মুক্তির ইশ্তেহার ঘোষণা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে তার তুল্য দৃষ্টান্ত আর কোথায়? মানুষকে বড় করে দেখাতেই তিনি লিখেছেন-
“বল বীর
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির
কিংবা
‘মম ললাটে রুদ্র ভবগান জ্বলে রাজ-রাজটীকা, দীপ্ত জয়শ্রীর
নজরুল তার বিদ্রোহী কবিতাতে দুটি বিষয় স্পষ্ট করে তুলেন-
১. শাশ্বত নয় দানব শক্তি এবং
২. মানবতাই চির কাল অপরাজেয়

মূলত পরাধীন জাতির হীনমন্যতা, মানসিক দাসত্ব উৎপাটনে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সমকালে সঞ্জীবনী টনিকের মতো গ্রাহ্য হয়। একটা কবিতা গোটা জাতিকে আলোড়িত করে। বহুলভাবে মুদ্রিত হয়ে পৌঁছে যায় সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে। যেন একটা স্বাধীনতার ইশতেহার। বিপ্লবের গোপন মেনিফেস্টো। যারা কবিতার পাঠক তারা বিস্মিত হন, যারা কোনকালেই কবিতার পাঠক নন, তারা অনলবর্ষী এই বাণী বিন্যাসের যাদুতে মুগ্ধ হন। বীররসের এমন জীবন্ত উদাহরণ, বাঙালি জাতির জন্যে যেন যুগ-যুগান্ত ধরে আকাক্সিক্ষত ছিল।  অথচ এত জনপ্রিয়তার মধ্যেও বাংলা ভাষায় সবচেয়ে সমালোচিত বিতর্কিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। একটা শ্রেণী এ কবিতাকে কবিতা বলেই মানতে রাজী নন। এবং শনিবারের চিঠি তার বহু প্যারোডি প্রকাশ করে। চিরকালের একটা হীনমন্য গোষ্ঠী নজরুলের আগমনকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপে বিষায়িত করে তুলে। শাসকবর্গের কোপানলে নিক্ষিপ্ত নজরুল। কিন্তু তিনিই হন বিজয়ী। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসেই কলকাতার এলবার্ট হলে মাত্র ত্রিশ বছরের কবিকে জাতির পক্ষ থেকে দেয়া হয় সংবর্ধনা। তাকে ঘোষণা করা হয় জাতীয় কবি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের মাত্র নবম বার্ষিকীতে নজরুল এই অসাধারণ সম্মাননায় ভূষিত হন।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার নব্বই বছর পূর্তিতেও আমরা দেখছি কবিতাটির জনপ্রিয়তা কোন ভাবেই হ্রাস পায়নি। কমেনি নজরুলেরও জনপ্রিয়তা। আগেও তিনি ছিলেন মূলত জন-নন্দিত কবি। এখনো তিনি জনগণের। আজকের সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদ নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে নজরুলের উপযোগিতা, তাঁর সংগ্রামী চেতনা, মানবমুক্তির দূর্মর অপরাজেয় আন্দোলন, তার বিকল্প কোথায়?

মহিবুর রহিম : কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক। বিভাগীয় প্রধান বাংলা বিভাগ, চিনাইর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনার্স কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Similar Posts

error: Content is protected !!