‘সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তরুণরা অলস হচ্ছে, কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে’

মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল

মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল মনে করেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণরা সমাজে ভালো-মন্দ দু’ধরনের ভূমিকাই রাখছে। তবে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দিনের খুব বড় একটা সময় এই মাধ্যমে ব্যস্ত থাকায় তরুণদের অলসতা বাড়ছে।

ডয়চে ভেলে : তরুণ প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে কেন?
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ছোটবেলায় মাঠে যেতাম। এখন মাঠ নেই। শিশুরা ঘরে থাকে। এখন তাদের বিনোদনের মাধ্যম বলতে সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানে তারা চ্যাট করছে, আড্ডা দিচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তি যোগাযোগ ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর কিছু ভালো দিক আছে। যেমন এবারের বইমেলায় আমার চারটি বই বের হয়েছে। সেটা আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দিলাম, আমার পাঁচ হাজার বন্ধু সেটা দেখল, তারা বইটা নিয়ে সমালোচনা করল, আলোচনা করল, তাতে আমি সমৃদ্ধ হলাম। তবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আবেগের চাপ থাকলে সেটা একটু রিলিজ করে। আর অপজিট সেক্সের প্রতি দুর্বলতা আমাদের সহজাত প্রবণতা।
এই সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব সহজেই মেয়েবন্ধু পাওয়া যায়, ছেলেবন্ধু পাওয়া যায়। এই যোগাযোগের কারণে মানুষের আবেগ একটা জায়গায় আবদ্ধ থাকছে না। চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। এই সম্পর্ক ব্যক্তি জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আরো ভালো উদাহরণও আছে। এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেই আমাদের গণজাগরণ মঞ্চের তৈরি হয়েছিল।
সব জায়গায় খারাপ গ্রুপ আছে, এখানেও আছে। ওই গ্রুপগুলো মেয়েদের টার্গেট করে, গৃহবধুদের টার্গেট করে। দীর্ঘদিন ধরে একটা সম্পর্ক তৈরি করে, এরপর তারা অনৈতিক সম্পর্ক করে এবং সেটা ভিডিও করে পরে ব্ল্যাকমেল করছে। এমন একজন নারী আমার কাছে এসেছিলেন তিনি ওই খপ্পরে পড়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্টটিও তাদের লিখে দিয়েছিলেন। তাতেও নিষ্কৃতি পাননি। পরে তিনি মানষিক রোগী হয়ে যান।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যে তরুণরা আগ্রহী হচ্ছে তার পেছনে কিসের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি?
আমরা সবাই কিন্তু নিজের কথাটা অন্যের কাছে বলতে চাই। এই শেয়ার করার প্রবণতা আগেও ছিল। আগে হয়ত এটা বন্ধু-বান্ধবের কাছে বলত। এখন সেটা সে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দিয়ে দিচ্ছে। সেটা দেখে অনেকে কমেন্ট করছে, অনেক রকম মন্তব্য হচ্ছে। সবার হাতেই যেহেতু এখন স্মার্টফোন আছে, সেই ফোনের ব্যবহার এক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে। মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতার কারণে আমাদের অনুভূতি যুগে যুগে যেটা ছিল, সেটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তরুণরা কি উপকার পাচ্ছে? এর ক্ষতিকর প্রভাবটা কী?
হ্যাঁ, অবশ্যই উপকার পাচ্ছে। এখানে যারা বই পড়ে, তাদের একটা গ্রুপ আছে। ওই বইগুলোতে কী আছে সেগুলো নিয়ে তারা আলোচনা করছে। আমি নিজেও এই ধরনের গ্রুপে ঢুকে ওদের আলোচনাগুলো দেখি। ওরা এমন সব বই পড়েছে যে বইগুলো দুর্লভ। আমি তাদের আলোচনা দেখে সমৃদ্ধ হই। আবার এর খারাপ প্রভাবও আছে, কারণ, তরুণরা এমন সব ওয়েবে ঢুকে যাচ্ছে, সেখানে পেশাদার নারী-পুরুষের রঙ্গলীলা তারা দেখছে। এতে করে তাদের বাস্তব জৈবিক চাহিদা বিকৃত হচ্ছে। আমি তো বলব এইসব সাইটে ঢুকে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ক্ষতিটা হচ্ছে বেশি। কারণ এ সব দেখার কারণে একটা মেয়ের স্বাভাবিক পিরিয়ড শুরু হওয়ার সময় ১৩ থেকে ১৫ বছর, এখন সেটা ৮ থেকে ৯ বছরেই হয়ে যাচ্ছে। এতে করে তার মধ্যে একটা যৌন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। তখন সে হয়ত খারাপ খপ্পরে পড়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়ে যাচ্ছে।

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া কি তরুণ সমাজের মনকে তুষ্ট করতে পারছে?
সোশ্যাল মিডিয়ার সবই যে খারাপ তা তো নয়। এখানে ভালো-খারাপ দু’টোই আছে। তবে সবচেয়ে খারাপ যেটা, সেটা হলো, আমাদের তরুণরা অলস হয়ে যাচ্ছে। তাদের শরীরের কর্মক্ষমতা অনেক কমে যাচ্ছে। তাদের উল্লাস করার ক্ষমতা বা হইচই করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তাদের মানসিক শক্তি কমে যাচ্ছে। যখনই তারা কোনো স্ট্রেসে পড়ে, সেটা থেকে উঠতে পারে না। আমরা যখন ছোটবেলায় মাঠে খেলতে গেছি, তখন হেরে গেলে সেটা সহ্য করার শক্তি অর্জন করেছি, আবার জিতে গেলে সেটা ধারণ করার শক্তিও অর্জন করেছি। এখন যেটা হচ্ছে, আমাদের ক্রিকেট দল হেরে গেলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভয়ংকরভাবে গালিগালাজ করা হচ্ছে। আবার জিতে গেলে রাস্তায় মিছিল নিয়ে বের হচ্ছে। মানে, এই হার-জিতের মধ্যে কোনো ভারসাম্য নেই। বিশেষ করে পরাজয় বরণ করার মতো কোনো শক্তিই তাদের মধ্যে নেই। খেলাধুলার মাধ্যমে ছোটবেলা থেকে হার-জিতের শক্তি সঞ্চিত হয়। এই সঞ্চয় তরুণ প্রজন্মের কম হচ্ছে। এতে করে তারা যে কোনো ছোটখাটো বিপর্যয়েও ভেঙে পড়ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের আগে ও পরে কী ধরনের পার্থক্য দেখা যায়?
সোশ্যাল মিডিয়াতে তারা যখন বসে, তখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা সেটা ব্যবহার করছে। এমনকি রাত জেগে তারা এটা ব্যবহার করছে। যখন তারা রাত জাগে, তখন পরের দিন সকালে স্কুলে বা কলেজে যেতে চায় না। এতে তাদের রেজাল্ট খারাপ হয়। বাবা-মা চাপ দেয়। তখন তারা মানসিক রোগী হয়ে যায়, আর আমাদের কাছে আসে। আমরা ছোটবেলায় যখন পড়তাম, তখন শুধুই পড়াশোনা করতাম। যখন খেলতে যেতাম, তখন খেলাধুলা করতাম। আর এখন তারা খেলাধুলা করে না, সারাদিন সারারাত এটার মধ্যেই বসে থাকে। এতে তাদের শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। তাদের ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। কিন্তু ব্রেনকে রাতে ঘুমাতে দিতে হবে। আপনি যদি ঠিকমতো না ঘুমানো, তাহলে আপনার ব্রেন ঠিক মতো কাজ করবে না। চাপে থাকবে। আপনার প্রোডাক্টটিভিটি কমে যাবে। আপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যহত হবে।

আমাদের তরুণদের একটা অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা কতখানি?
শুধু যে অপরাধে জড়াচ্ছে, তা নয়, আবার অপরাধের বিরুদ্ধেও তারা সোচ্চার হচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই কারণে নারীর প্রতি বা পুরুষের প্রতি আমাদের তরুণদের শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। একজন আরেকজনকে ছোট করে মতামত দিচ্ছে। তাদের মধ্যে ভোগবাদী অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এখানে ভোগবাদী অস্তিত্বের চেয়ে মমতা বা ভালোবাসার জায়গান থাকতে হবে। আমাদের তরুণদের মধ্যে বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। তারা নৈতিকতা হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে তারা যে কোনো ধরনের অপরাধে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু তারা সেটি বুঝতে পারে না।

সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর দিক থেকে বের হয়ে আসার পথগুলো কী কী?
আমাদের টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। আমি বলব, আমরা যদি আমাদের আকাশসীমাটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তাহলে অনেক উপকার পাওয়া যাবে। ভালো জিনিসই শুধু আমরা ঢুকতে দেব, খারাপগুলো ঢুকতে দেব না। তাহলে অনেক কিছুই ঠিক হয়ে যাবে। বাজে ওয়েবসাইট ঢুকতে দেব না। কিছু নিয়মনীতি যদি থাকে, মিডিয়াতে অন্যকে অপদস্থ করা যাবে না। কেউ কিছু করলে তার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। কিন্তু হুট করেই সামাজিক যোগাযোগে কিছু বলা যাবে না। যেমন ধরুন, রাজন হত্যার বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতেই জনমত গড়ে উঠেছে। খারাপ জিনিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা বিশ্ব আমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে।

সূত্র : ‘সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তরুণরা অলস হচ্ছে, কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে’  [ডয়চে ভেলে, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭]

Similar Posts

error: Content is protected !!