রাজীব সরকার পলাশ ।।
চারদিকে ধর্ষণকাম, নৃশংসতা, ধর্মান্ধতা আর পৈশাচিকতার যে মহাযজ্ঞ চলছে তা নিতান্তই উদ্বিগ্নতাকে আন্দোলিত করে। ‘অতীত’ কোনরকমে গেলেও ‘বর্তমান’ লজ্জাজনক আর ‘ভবিষ্যৎ’ শঙ্কার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ক্ষুদ্র এ জীবনকাল অনেক কিছুই দেখিয়েছে, কিছু শিখিয়েছেও। দিন দিন হয়ে যাচ্ছি নিষ্ঠুর। কিছুদিন আগেও কোন নিষ্ঠুরতার চিত্র অনেকদিন মানুষকে ভাবাতো, ঘোরের ভিতর অনুশোচনা বা ঘৃণায় অনেকদিন পোড়াত। আজ তাও বিলুপ্তির পথে। যেন আজ মরলে কাল সর্বোচ্চ একদিন।
ইদানিং নৃশংসতা এবং পৈশাচিকতার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছি আমরা। আর তৈরি হচ্ছে এক-একটা প্রেক্ষাপট। যেমন- স্বামী স্ত্রী’কে, স্ত্রী স্বামী’কে, সন্তান মা’কে, সন্তান বাবা’কে, মা সন্তান’কে, বাবা সন্তান’কে হত্যা বা ধর্ষণে আজ খুব একটা অপরাধবোধ কাজ করে না!
-কেন বা কখন কাজ করে না?
যখন কোন অপরাধীর বিচার সঠিক সময়ে সঠিকভাবে হয় না। যখন লঙ্ঘিত হয় ‘মানবতা’। সেখানে ‘মানবতা’ শব্দটার অস্তিত্ব বিলীন হতে হতে অমানবিকতার ছায়া এসে গ্রাস করে ফেলে। তখন ‘মানবতা’ ‘নির্মমতা’য় রূপ নেয়। যার প্রভাব পড়ে মৃতপ্রায় ‘সমাজ’ নামক শব্দে। মানবিকতার চরম বিপর্যয় আজ সমাজব্যবস্থার বিলুপ্তির অন্যতম কারণ বলেই মনে হচ্ছে। আজ পঞ্চাশোর্ধ একজন শিক্ষিকা তার “পরকীয়া” শব্দটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্বামীকে হত্যায় কোন দ্বিধায় কাজ করছে না। সেখানে এটা প্রেম বা ভালোবাসা নয়। তা বিকৃত যৌনতা’রই বহিঃপ্রকাশ। তবে সেখানে পারিবারিক বন্ধনে ‘দৃঢ়তা’র অভাবটাও কম নয়। সম্মিলিত ভাবেই হোক আর পারিবারিক ভাবেই হোক, ‘পরিবার’ শব্দটায় ‘দৃঢ়তা’ এবং ‘বিশ্বাস’ সৃষ্টি খুবই জরুরি। দরকার এ নিয়ে মুক্ত আলোচনা বা কাউন্সেলিং। বেরিয়ে আসতে পারে অনেক সমাধান। পরিবেশে প্রয়োজন সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ।

সংস্কৃতি শব্দটার সাথে ‘অপ’ যোগ করে দিয়ে নানান ভাবে অ-বিচার বিশ্লেষণ করে বেশ ধোলাই করছি নিয়মিত। খারাপটা বাদ দিয়ে সুন্দরটাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা দিন দিন হারিয়ে ফেলছি। একটা জায়গায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটাকে দিনদিন ক্ষয় করে ছোট্ট পরিসরে নিয়ে আসছি। যে জায়গায় সমাজটাকে অবক্ষয়ের সুযোগ করে দিচ্ছি। সংস্কৃতির একটা অংশ জুড়ে আছে নাটক।
নাটককে বলা হয় সমাজের দর্পন বা সমাজ বদলের হাতিয়ার। মহান স্বাধীনতা দিবসের একটি ঘটনা তাপ থেকে অধিকতর তাপে পরিতাপ দিচ্ছে নিয়মিত। শুক্রবার (৬ মার্চ ১৮ ইং) সকালে ‘ দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পুনর্বার সংবাদটি দেখে ভেতরে পরিতাপটাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আমার বাবা কয়েকটি জেলার নাট্যজগতের এক সময়ের বেশ পরিচিত মুখ। নাটকে “বিবেক” চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডাকা হতো বাবাকে। অভিনয় থেকে সরে এসেছেন প্রায় এক যুগেরও বেশি। তারও কিছুদিন আগে থেকেই বেশ ভালো গাইতেন শংকর ভৌমিক। সুমধুর কণ্ঠে ধীরে ধীরে তিনি তৈরি করে নিয়েছিলেন নিজের অবস্থান। নাট্যমঞ্চে “বিবেক” চরিত্রে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন নিজেকে। বাবাকে অনেক শ্রদ্ধা করতেন তিনি। সর্বশেষ কিছুদিন আগে শংকরের শেষ কণ্ঠ শুনেছিলাম পাকুন্দিয়ার পাটুয়াভাঙ্গা একটি স্কুল মাঠে বেশ বড় পরিসরে মঞ্চস্থ একটি নাটকে। রাতভর নাটক প্রাণভরে উপভোগ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ এলাকার হাজারো নারী-পুরুষ।
গত ২৬ মার্চ ইটনা উপজেলার পাঁচকাহনিয়া গ্রামে ‘নরসুন্দা অপেরা’ সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন ‘আপন দুলাল’ নাটকে অভিনয় করতে শংকর। সাথে আরও ৩৬ জনসহ একটি নাট্যদল। নাটক শুরুর আগেই অন্ধকারে ধর্মান্ধের একটি দল হামলা করে নাট্যমঞ্চে। দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে সকলেই। ভাংচুর হয় মঞ্চ, সাউন্ড সিস্টেম ও অন্যান্য জিনিসপত্র। নাট্যকর্মীদেরকে মারধর করা হয় কয়েকজন আত্মগোপন করে এবং মধ্যরাতে ট্রলারযোগে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে সকলেই রওনা দেন। নৌকাটি মাঝ নদীতে এলে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। সহকর্মীরা সাঁতরে নদীর তীরে উঠলেও শিশুশিল্পী তুহিন এবং ‘বিবেক’ চরিত্রের অভিনেতা শংকর ভৌমিক উঠতে পারেননি। পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় শংকরের। শংকর ভৌমিকের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাগলাইল এলাকায়। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি শংকরের মৃত্যুতে ২ সন্তান এবং স্ত্রীর চোখে আজ কেবল অন্ধকার। শংকর ভৌমিকের মৃত্যু ঘটনাটি বাবাকে বলার পর তিনি অনেক মর্মাহত হলেন।
সবকিছুর পরে এতটুকুই মনে হল যেন, শুধু একজন শিশুশিল্পী বা শংকর মৃত্যুবরণ করেননি; মৃত্যুবরণ করেছে মানুষ, মৃত্যুবরণ করেছে সংস্কৃতির সৈনিক, মৃত্যুবরণ করেছে একজন “বিবেক”।
লেখক : সাংস্কৃতিক কর্মী, বানিয়াগ্রাম, কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ।

