পহেলা বৈশাখ : ঐতিহ্য ও সংস্কার

নাসিরউদ্দিন পিটু ।।

যতদূর মনে পড়ে পহেলা বৈশাখ-এ আমাদের গ্রামের মানুষ নতুন বা পরিষ্কার কাপড় পড়তো। সারাদিন খুব ভালোভাবে চলার চেষ্টা করতো। যারা পড়ালেখা করতো তারা নিয়মমত পড়তো, যারা কাজ করতো তারাও খুব সচেতনে সঠিক ভাবে কাজ করতো। সময় মতো খেতো। খাওয়ার জন্য সেদিন বিশেষ ব্যবস্থা প্রত্যেকের সামর্থ্যের মধ্যে ভালো কিছু করার চেষ্টা করতো। যারা প্রায় সারা বছরই সকালবেলা পান্তা ভাত খেতে হতো তারাও নতুন গরম ভাত খাওয়ার চেষ্টা করতো।

বৈশাখ মাস ইলিশের মৌসুম না। তাই ইলিশ খেতে হবে এমন কোন নিয়ম ছিল না। তবে অনেক পরিবারে তিতা জাতীয় খাবার : গিমাই শাক, নিম পাতা ভাজি/ভর্তা এছাড়াও থানকুনি পাতার রস/ভাজি খাওয়ার চল ছিল। বলা হতো বছরের প্রথম দিন তিঁতা খেলে রোগবালাই দূরে থাকে।

বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের আশির দশকের চিত্র কি ছিল জানি না। কিন্তু দেশের প্রায় সর্বত্রই অনেক মানুষ পান্তা খেতো। কারো কাছে ভালো লাগতো কারোবা খেতে হতো। কিন্তু পান্তা আজ রীতিমত ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এর সাথে আবার ইলিশ যুক্ত হয়ে তা আজ পরিণত হয়েছে সাধারণের সীমার বাইরের ধনীক ও পুঁজিবাদী সমাজের সংস্কৃতি। যাদের পান্তা‘র সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না কোন কালে তারাই আজ এর ধারক ও বাহক। একটি দেশের অধিকাংশ মানুষ বৈশাখের প্রথম দিন যেভাবে উদযাপন করতে পারে/ করে সেটাই এদেশের সংস্কৃতি। তাই লাল-সাদা জামা-কাপড় পড়ে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো, অযৌক্তিক মূল্যে পান্তা ইলিশ খাওয়া, কনসার্ট দেখা কিছুতেই আপামর জনসাধারণের সংস্কৃতি হতে পারে বলে আমি মনে করি না।

বরং সেদিন গ্রামের সবাই মিলে মিশে থাকার চেষ্টা করতো। ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলত। সারাদিন ভালো ভাবে চলার চেষ্টা করতো। মানুষ মনে করতো এই দিনটি যদি খুব ভালোভাবে যার যার কাজের মধ্যে থেকে পার করতে পারা যায় তাহলে সারা বছর ভালো যাবে। তাই সবাই মনে মনে মঙ্গল প্রতিজ্ঞা করতো। এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রতিটি পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মূল মন্ত্র। আসুন সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি এবার পহেলা বৈশাখে আমরা- সারা দেশের মানুষ আগামী এক বছর হিংসা বিভেদ ভুলে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে যেন কাটাতে পারি।

লেখক : আবৃত্তিশিল্পী

Similar Posts

error: Content is protected !!