বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু নদী ও বন্যার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের জীবিকা ও সংগ্রামের অনন্য ইতিহাস। একসময় গোবরের লাকড়ি, খরস্রোতা নদীতে জেলেপেশা, কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ—এসবের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক পেশাই আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই হারানো ঐতিহ্য ও টিকে থাকা সংগ্রামের গল্প নিয়ে শুরু হয়েছে নিকলীকেন্দ্রিক প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর ধারাবাহিক ফিচার প্রতিবেদন—“হাওরাঞ্চলের ব্যতিক্রমী জীবিকা”। আজ থাকছে “পাতা টুহানি”
মোহাম্মদ তোফায়েল আহছান ।।
গ্রামাঞ্চলের সকাল-বিকেলের পরিচিত দৃশ্য ছিল শিশু-কিশোরদের পাতা কুড়ানোর হুড়োহুড়ি। উজান কিংবা ভাটি—প্রায় সব গ্রামীণ এলাকায় এই প্রথা ছিল প্রচলিত। দরিদ্র পরিবারের জ্বালানি সংকট, দারিদ্র্য আর বিকল্প জ্বালানির অভাব মেটাতে শিশু-কিশোরদেরই নামতে হতো এই কাজে।
পাটের বস্তা (ছালা) কিংবা হাওরাঞ্চলের পরিচিত উড়া বা খাঁচা ভরে তারা সংগ্রহ করতো গাছের ঝরে পড়া পাতা। বাড়ির আঙিনায় শুকিয়ে সেগুলো ব্যবহার হতো রান্নার জ্বালানি হিসেবে। তবে শুকানোর সময় না পেলেও কাঁচা পাতা দিয়েই চুলা জ্বালানো যেতো। যদিও তখন প্রয়োজন হতো কিছুটা অতিরিক্ত পাতা।
পাতা কুড়ানির ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
গ্রামীণ জীবনে পাতা কুড়ানির প্রথা নতুন কিছু নয়। মানুষ যখন গ্রামে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে এবং নিয়মিত রান্না শুরু করে, তখন থেকেই গাছ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতা, ডালপালা ও খড়-খড়কুটো রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান সমাজে ধান কাটার পর খড়, তুষ বা ধানের খোসার পাশাপাশি গাছের শুকনো পাতা ছিল গ্রামীণ রান্নাঘরের অন্যতম ভরসা।

সামাজিক কারণ
পাতা কুড়ানোকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ কাজ বা পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়নি। পরিবারের নারী ও শিশু-কিশোর-কিশোরীরা স্বাভাবিক দায়িত্ববোধ থেকেই এই কাজ করতো। শিশু-কিশোর-কিশোরীরা ভোরবেলা বা বিকেলে ঝরে পড়া পাতা কুড়াতে যেত। অনেক সময় সেটা তাদের কাছে খেলার মতো হয়ে উঠত। আবার কখনো প্রতিযোগিতা—কে কত দ্রুত বেশি পাতা জোগাড় করতে পারে। এটাও ছিল তাদের আনন্দের অংশ। ফলে একদিকে ছিল দারিদ্র্যজনিত পারিবারিক চাপ, অন্যদিকে ছিল শিশুর নির্দোষ খেলা ও সামাজিক আনন্দ।

অর্থনৈতিক কারণ
দারিদ্র্য ছিল পাতা কুড়ানির অন্যতম মূল কারণ। দরিদ্র পরিবারগুলো নগদ অর্থ দিয়ে জ্বালানি কাঠ বা কয়লা কিনতে পারত না। এজন্য তাদের খুঁজতে হতো, বিনামূল্যে বা ন্যূনতম মূল্যে জ্বালানির উপকরণ। গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যের উৎস। শিশুরা যখন পাতা কুড়িয়ে আনত, তখন পরিবারের প্রতিদিনের রান্নার খরচ কমে যেত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শ্রমকে কখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। অথচ নারী, শিশু-কিশোর-কিশোরীদের সময় ও পরিশ্রম পরিবারের জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা অনেকটাই লাঘব করত।
পাতা কুড়ানির এই কাজকে যদি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়, তবে এটাকে বলা যায় এক ধরনের “অদৃশ্য অর্থনীতি”—যেখানে শিশু-কিশোর ও নারীর শ্রমকে বিনামূল্যে ব্যবহার করা হতো। আর তাদের প্রচেষ্টাই ছিল পরিবারের রান্নাঘরের অন্যতম শক্তি।
কখন কিভাবে কুড়ানো হতো
পাতা কুড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট ছিল দুটি সময়—ভোরবেলা আর পড়ন্ত বিকেল। সূর্য ওঠার আগে কিংবা বিকেলের আলো নিভে যাওয়ার আগে দলবেঁধে শিশু-কিশোররা ছুটে যেতো গাছপালায় ঘেরা বাড়িগুলোয়। কেউ বাঁশের কঞ্চি ধারালো করে তাতে পাতা গেঁথে নিতো, কেউ নারকেলপাতার শলার ঝাড়ু দিয়ে পাতা একত্র করতো, কেউ আবার তার বা দড়িতে পাতা গেঁথে বানাতো অদ্ভুত মালা। এসব ছিল একদিকে কাজ, অন্যদিকে খেলার মতো আনন্দ।
তাদের মধ্যে চলতো প্রতিযোগিতা—কে কত দ্রুত বেশি পাতা জোগাড় করতে পারে! হেসেখেলে চলা এই প্রতিযোগিতা মাঝে মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়ায় রূপ নিলেও বেশি সময় স্থায়ী হতো না। কাজ শেষে আবার সবাই একসাথে খেলাধুলায় মেতে উঠতো।

মৌসুমভেদে পাতা কুড়ানো
বছরের সব সময় পাতা কুড়ানো একরকম হতো না। মৌসুমভেদে এর মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য দেখা দিতো। শীতকালে বিভিন্ন ধরনের গাছ থেকে প্রচুর শুকনো পাতা ঝরে পড়তো, তাই এই সময়ে তুলনামূলক সহজ ও কম সময়ে বেশি পরিমাণে পাতা পাওয়া যেত। গাছের নিচে একসাথে অনেক শুকনো পাতা জমে থাকতো, শিশুরা দ্রুত সেগুলো সংগ্রহ করতে পারতো। আবার বর্ষাকালে পরিস্থিতি হতো ভিন্ন। টানা বৃষ্টির কারণে ঝরে পড়া পাতা ভিজে যেতো, পচে যেতো, কিংবা নষ্ট হয়ে যেতো। ফলে শুকনো পাতার জোগান কমে যেতো এবং কুড়ানোও কঠিন হয়ে পড়তো। গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড রোদে অনেক গাছ শুকিয়ে যায় বা পাতাঝরা বাড়ে। তখন পাতা সংগ্রহ অপেক্ষাকৃত বেশি হতো। তবে আষাঢ়-শ্রাবণের মতো মৌসুমে ভিজে বা আধাপচা পাতা সংগ্রহ করে শুকাতে বাড়তি কষ্ট করতে হতো। অর্থাৎ, বছরের সব সময়েই পাতা কুড়ানো হতো; কিন্তু মৌসুমের তারতম্যের কারণে এর সহজ-অসুবিধা, পরিমাণ এবং মানে অনেক পার্থক্য দেখা দিতো।
ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে পার্থক্য
হাওরাঞ্চল (যেমন কিশোরগঞ্জের নিকলী, ইটনা, মিঠামইন): এখানে চারপাশে খোলা মাঠ ও জলাভূমি থাকায় তুলনামূলকভাবে বড় আকারের গাছ কম। তবে গ্রামগুলোর বাড়ির আঙিনায় যেসব গাছ ছিল—কাঁঠাল, আম, জাম, বড়ই, কামরাঙা, পেয়ারা, শিমুল ইত্যাদি—সেসবের পাতা সংগ্রহ করতো শিশুরা। মৌসুমভেদে এখানে পাতার জোগান বিশেষভাবে কম-বেশি হতো।
শুষ্ক এলাকা (যেমন- রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর): এখানে শীত ও গ্রীষ্মকালে পাতাঝরা সবচেয়ে বেশি হতো। গ্রীষ্মে শুকনো গরম হাওয়া (লু) বইতে থাকায় গাছের পাতা প্রচুর ঝরে যেতো। ফলে শুষ্ক অঞ্চলে শুকনো পাতার জোগান তুলনামূলক বেশি ছিল।
বনাঞ্চল (যেমন সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের কিছু অংশ): এসব অঞ্চলে বড় বড় বনজ গাছ থাকায় পাতা কুড়ানোর সুযোগ বেশি থাকতো। তবে বর্ষাকালে পাতাগুলো দ্রুত পচে যেতো বলে শুকনো পাতার ঘাটতি দেখা দিতো।
স্থানভেদে পাতা কুড়ানির বৈচিত্র
দেশের বেশকিছু এলাকায় পাতা কুড়ানির পেশার কথা জানা গেছে। একেক অঞ্চলের পাতা কুড়ানির পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয়তা একেক রকম। দেশের বনভূমি বা বনাঞ্চলকেন্দ্রিক পাতা কুড়ানি বা পরিষ্কার রাখার জন্য আলাদা লোকবল রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত পাতা জমানোর পর একসাথে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কোথাও কোথাও বনভূমি বা বনাঞ্চল ঘেঁষা এলাকার নারী-পুরুষেরা দিনমান পাতা জমিয়ে জড়ো করেন। সেগুলো বিক্রি করে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের সুযোগও রয়েছে।
নগরজীবনে গাছপালা বা বনভূমি আগের মতো এখন আর নেই। যতটুকু দেখা মেলে তা কেবল সংরক্ষিত কিছু উদ্যান, পার্ক কিংবা ভ্রমণের জন্য সংরক্ষিত এলাকায়। শহরকেন্দ্রিক এসব এলাকায় থাকা গাছের ঝরা পাতা পরিষ্কার করার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট জনবল। দিনের শুরুতে বা পড়ন্ত বেলায় ঝাড়ু দিয়ে পাতা এক জায়গায় স্তূপ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

বিভিন্ন দেশে ঝরা পাতা সংগ্রহ (Leaf Collection)
ভারত: গ্রামীণ ভারতের অনেক জায়গায় ঝরা পাতা সংগ্রহ এখনো প্রচলিত। বিশেষ করে ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ ও ওডিশায় নারীরা শালপাতা ও মহুয়ার পাতা সংগ্রহ করেন। এই পাতা দিয়ে তারা পাতালির থালা (ডোনা/পাত্র) তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন। শালপাতার তৈরি প্লেট ও বাটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় শহরেও এর চাহিদা আছে।
নেপাল: পাহাড়ি অঞ্চলে নারী ও শিশুরা ঝরা পাতা কুড়িয়ে পশুখাদ্য হিসেবে (গরু, মহিষের বিছানা বা মেঝে বিছানোর জন্য) ব্যবহার করে। শুকনো পাতা রান্নার চুলায় জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
আফ্রিকার দেশগুলো (কেনিয়া, উগান্ডা, নাইজেরিয়া): অনেক গ্রামীণ পরিবার শুকনো পাতা ও ঝোপঝাড় থেকে কুড়ানো জ্বালানির বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে রান্নার আগুন জ্বালায়। এ ছাড়া ঝরা পাতা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সার (কম্পোস্ট) তৈরির জন্যও সংগ্রহ করা হয়। শিশু-কিশোররাও এ কাজে যুক্ত থাকে, বিশেষ করে কৃষিজীবী পরিবারে।
লাতিন আমেরিকা (পেরু, বলিভিয়া, মেক্সিকো): এ অঞ্চলে শুকনো পাতা রান্নার জন্য চুলায় ব্যবহারের পাশাপাশি পশুখাদ্য ও খামারের সার হিসেবে ব্যবহার হয়। আন্দিজ পর্বতমালার কিছু এলাকায় ঝরা পাতা শুকিয়ে শীতকালে ঘরের ভেতরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ইউরোপ: ইউরোপে ঝরা পাতা সাধারণত পরিবারে নিজেরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে না। কিছু জায়গায় (যেমন: পূর্ব ইউরোপে) কৃষিজমিতে ব্যবহারের জন্য সার বানাতে সংগ্রহ করা হয়। পশ্চিম ইউরোপে এটি মূলত পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব—পরিষ্কার করে রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে পাঠানো হয়।
এছাড়াও পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে ঘরের আঙিনা পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রাখা একটি নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিটি পরিবার তাদের নিজস্ব বাগান বা আঙিনা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। বাড়ির সামনে বা পেছনের অংশে গাছ-গাছালির ঝরে পড়া পাতা, ডালপালা কিংবা অতিরিক্ত বেড়ে ওঠা ঘাস নির্দিষ্ট সময় পর পর কেটে বা ছেঁটে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, ঘাস সাধারণত সমান উচ্চতায় ছাঁটা হয়, যাতে গোটা আঙিনা একরকম পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক দেখায়।
এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ার ফলে যে বাড়তি ঘাস, পাতা বা ডালপালা জমে ওঠে, সেগুলো এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা হয় না। প্রতিটি পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন আলাদা করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ডাস্টবিন বা রিসাইক্লিং বিন সরবরাহ করে। নাগরিকরা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সেই বর্জ্য আলাদা ব্যাগ বা কন্টেইনারে ভরে সংশ্লিষ্ট ডাস্টবিনে জমা রাখেন। অনেক জায়গায় বাগানের শুকনো পাতা ও ঘাস পুনর্ব্যবহারযোগ্য (compostable) বর্জ্য হিসেবে আলাদা সংগ্রহ করা হয়, যা পরবর্তীতে জৈব সার (কম্পোস্ট) তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এ কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, যেমন পৌরসভা বা কাউন্সিল, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করে থাকে। অনেক দেশে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আইনও রয়েছে। যদি কেউ আঙিনা অবহেলা করে অপরিষ্কার রাখে বা বর্জ্য সঠিকভাবে না ফেলে, তবে তাদেরকে জরিমানা করা হতে পারে।

হাওরাঞ্চল বা গ্রামীণ জীবনে অবমূল্যায়িত শ্রম
পাতা কুড়ানো শিশু-কিশোররা কখনো বুঝতেই পারতো না যে, তাদের এই শ্রম আসলে পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ। দারিদ্র্যের চাপে অনেকেই পড়ালেখা থেকে ছিটকে যেতো, বেড়ে উঠতো নানা সংকটে জর্জরিত হয়ে। অথচ তাদের এই সময়, পরিশ্রম, ত্যাগকে সমাজ কখনোই অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বিবেচনা করেনি। এই কাজ ছিল পরিবারের জন্য অপরিহার্য; কিন্তু পেশা হিসেবে কখনো স্বীকৃতি পায়নি।
পরিবর্তিত সময়, পাল্টে যাওয়া প্রথা
যুগের সাথে পাল্টেছে গ্রামীণ জীবনের চিত্রও। যদিও হাওরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলো রান্নার আগুন জ্বালাতে এখনো মূলত মাটির চুলা, ধানের খোসা (ছোহল ও কুড়া), তুষ, বাঁশ ও কাঠের অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে। কোথাও ব্যবহার হচ্ছে ইটভাটার পোড়ানো লাকড়ির কয়লা। তবে শহরমুখী প্রভাবের কারণে কিছুটা স্বচ্ছল অনেক পরিবার ধীরে ধীরে উন্নত চুলা, ই-চুলা (ইনডাকশন, ইনফারেড), এলপিজি বা বিকল্প আধুনিক জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।
ফলে যে বাড়িগুলোর আঙিনা একসময় শিশু-কিশোররা নিজ উদ্যোগে পরিবারের জ্বালানির জোগানের জন্য পরিষ্কার করতো, সেই বাড়িগুলোতে একই কাজের জন্য এখন টাকার বিনিময়ে কাজের লোক নিতে হয়।
পাতা কুড়ানির স্মৃতিকথা
কিশোরগঞ্জের হাওরের প্রবেশদ্বার খ্যাত নিকলী সদর ইউনিয়নের আব্দুর রহিম। বয়স আনুমানিক পঁয়তাল্লিশ। পাতা কুড়ানির সেই দিনগুলোর কথা জানালেন। তখন বয়স হয়তো ৮/১০ বছর হবে। শুনুন তার কাছ থেকেই। “ভোর অইলেই বাঁশের জিংলা, গুনসুই, গুনসুতা আর বস্তা লয়া যাইতাম পাশের বাড়িতে। গাছতলায় ফাতা ফরা তাকতো। লগে আরো কেউ কেউ যাইতো। হেরার সাতে মজা কইরাই টুহাইতাম। দেহি কে বেশি জমায়। মইদ্যে মইদ্যে ঠেলাঠেলি করতাম, ঝগড়াও অইতো। একটু ফরে সব ভুইলা একসাতেই কেলতাম। টুহায়া বাড়ি গেলে মা অই ফাতা চুলায় দিয়া আগুন দরায়া রানতো। অত কিছু বাবি নাই, আফনের কথাতে মনে অইলো, বিরাট কামই করছি।” বলে হাসতে হাসতে কুটি কুটি।
কারপাশা ইউনিয়নের শেফালি। পাশের গ্রামেই বিয়ে হয়েছে। তিন সন্তানের মা। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ভালোই আছেন। সেদিনের ১১/১২ বছরের সেই কিশোরী বলেন, “আমরার বাড়িত টাকা-পয়সা বেশি আসিন না। বাবার খাটনি কামাইয়েই সংসার চলতো। ছোট ভাইরে লয়া আমি পাতা টুহাইতে যাইতাম। হাছুইন দিয়া ঝারতে ঝারতে এক জায়গায় জমাইতাম। ফরে অনেকগুলা অইলে ফাতিত ভরতাম। শুকাইলে মা এইতা দিয়াই রানতো। তহন মনে অইতো, এইডা আমরার দায়িত্ব। তবে মাইজে মাইজে যাইতে মন চাইত না। ফুলাফান মানুষ তো, খেলারও ইচ্চা লাগত। কিন্তু কেডা ভাবছে, আমরার কামে সংসারে কত্ত সাহায্য অইতাছে!”
তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। সাবিকুন্নাহার সাথীরা দুই বোন এক ভাই। সবার বড় সাথী। সবচেয়ে প্রিয় খেলার সঙ্গী ছিলেন তার ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন। যেখানেই যেতেন, সাথে করে একমাত্র ভাইকেও নিয়ে যেতেন। বড় আদরের। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নে গ্রামীণ জীবনে বেড়ে ওঠা সাথীদের পরিবারে পড়ালেখার গুরুত্ব ছিল। অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও বাবা-মা সন্তানদের সাধ্যমতো পড়িয়েছেন। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছেন তিনি। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় থাকেন। কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, “পাতার মালা বানাতে আমার বেশি ভালো লাগতো। লম্বা তারের মধ্যে একটা একটা করে পাতা গেঁথে তারটা ভরে গেলে মালা বানিয়ে গলায় ঝুলাতাম। কোনোদিন ২টা, কোনোদিন ৩টা মালা বানাতাম। পাতা কুড়ানির কাজটা আমার কাছে আসলেই খুব মজা লাগত। বড়রা বলতো কাজ কর। আমি ভাবতাম খেলতে খেলতে পাতা কুড়ানো আবার কাজ হয় কিভাবে! কিন্তু বাড়ির রান্নাবান্না যখন পাতা দিয়েই হতো, তখন কিছুটা বুঝতাম ওই খেলায় খেলায় বড় কাজই করে ফেলেছি। এখন আর পাতার জন্য যাওয়া লাগে না। শহরে গ্যাসের লাইনে চলে চুলা। গ্রামের বাড়িতে এলেও সিলিন্ডার ব্যবহার করি। কিন্তু ছোটবেলার দিনগুলা খুব মনে পড়ে।” কথা বলতে বলতে চোখ ছলছল করে ওঠে সাবিকুন্নাহারের; যেন এইতো সেদিনের কথা। অথচ পেরিয়েছেন ৫০ বছর। পরিবারের ছোট সদস্যদের সাথে খেলা করেই কাটে দিন। ক্রমশ দুর্বল হচ্ছেন। শুধু উজ্জ্বল হয়ে থাকছে ছোট্টবেলার সেই আনন্দময় দিনগুলো।
স্থানীয়দের ভাবনায় পাতা কুড়ানি
আবদুল জলিল (৭২)। ব্যবসায়ী, সাজনপুর, নিকলী
আমাদের ছোটবেলায় ভোর হলেই উঠোনজুড়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হতো। শিশু-কিশোররা পাতা কুড়াতে গিয়ে হইচই করত। অতিরিক্ত শব্দে মাঝে মাঝে একটু মেজাজ হতো। তবে সব মিলিয়ে হই-হুল্লোড় করাটা একেবারে মন্দ লাগত না। একদিকে আঙিনায় ঝরে পড়া পাতা ওরা পরিষ্কার করে দিতো। অপরদিকে তাদের কুড়ানো পাতায় জ্বলতো রান্নার চুলা। এটি শুধু দারিদ্র্যের গল্প নয়, বরং গ্রামের সংস্কৃতিরও অংশ ছিল। এখনকার ছেলেমেয়েরা এসব কথা শুনে অবাক হয়।
সালেহা খাতুন (৬০)। গৃহিণী, দামপাড়া, নিকলী
অভাবী সংসারে পাতা কুড়ানো ছিল আশীর্বাদ। শিশুরা আনন্দের সঙ্গেই কুড়াতো; কিন্তু ঘরে সেটিই হয়ে উঠত বড় সহায়। অনেক সময় খড় বা কাঠ পাওয়া যেত না। তখন শুকনো পাতাই রান্নার একমাত্র ভরসা হতো। এভাবেই পরিবারের পাশে দাঁড়াত শিশুরা।
আব্দুস সামাদ (৫৫)। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক, সিংপুর, নিকলী
পাতা কুড়ানো কেবল খেলার অংশ ছিল না, বরং তা ছিল এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ছোট ছোট শিশুরা বুঝতেও পারত না, তারা পরিবারের টিকে থাকার লড়াইয়ে কত বড় ভূমিকা রাখছে; কিন্তু সমাজ তাদের শ্রমকে পেশা হিসেবে গুরুত্ব দেয়নি। নতুন প্রজন্মের এই ইতিহাস জানা জরুরি।
রুবিনা সুলতানা (৩৫)। সমাজকর্মী, হাওরাঞ্চল
সামাজিক সেবামূলক কাজে যুক্ত হয়ে মিশতে হচ্ছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে। অনেক সময় দায়িত্বের খাতিরেই সংগ্রহ করতে হয় দিনবদলের ঘটনাচক্র। জানতে পারি সেই সময়ের অনেক তথ্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সহজলভ্য ও বিনামূল্যে পাওয়া জ্বালানি, ঝরে পড়া গাছের পাতা। আজ রান্নার বিকল্প অনেক জ্বালানি সহজলভ্য হলেও একসময় নারী ও শিশু-কিশোরদের পাতা কুড়ানোয় গ্রামীণ পরিবারগুলো টিকে থাকত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এই পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করিনি। যা গ্রামের মানুষ হয়তো আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
হারিয়ে যাওয়া এক সংস্কৃতি
পাতা কুড়ানো ছিল দারিদ্র্যের অবলম্বন, আবার শিশু-কিশোরদের শৈশবের আনন্দও। প্রথাটি হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো সংস্কৃতি। অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি হয়তো ছোট কাজ; কিন্তু সামাজিক ইতিহাসে তা ছিল এক অসামান্য অবদান। এই কাজের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল আত্মনির্ভরতা, সহযোগিতা আর পারিবারিক বন্ধন।
লেখক: সংবাদমাধ্যম কর্মী


