মোঃ নুরুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি ।।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের গোরাদিঘা, বরুলিয়া, ধনু নদী ও ঘোড়াউত্রা নদীর ভাঙনকবলিত এলাকায় ড্রেজার দিয়ে দেদারসে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। এতে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও নদীতীরবর্তী গ্রাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এ বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
নিকলী উপজেলায় সরকারি অনুমোদিত কোনো বালুমহাল নেই। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করে অবৈধ উপায়ে নদী থেকে বালু তুলে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে। রাতের আঁধারে ধনু নদী, বোয়ালিয়া নদী, পাগলার খাল ও ঘোড়াউত্রা নদীর সফরিকান্দা এলাকা থেকে দিনের আলো এড়িয়ে গভীর রাতে ড্রেজার চালিয়ে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিকলীর বিভিন্ন নদীতে বালু উত্তোলনে আওয়ামী যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপির একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মিলেমিশে কাজ করছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে এই উত্তোলন কার্যক্রম। প্রতি ঘনফুট বালু বিক্রি হয় তিন টাকা দরে, আর প্রতি রাতে একাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার ঘনফুটেরও বেশি বালু তোলা হচ্ছে। এই বালু দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে হাওরের ফসলি জমি, ডোবা, গর্ত ও পুকুর ভরাটের কাজ চলতে দেখা যায়।
নতুন করে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন
অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলায় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং এলাকায় নতুন করে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। সিংপুর ইউনিয়নের উত্তর হাটি, পাতারকান্দি, বরহাটি, মলাহাটি, ইসলামপুর ও বাজারহাটি এলাকার অনেকের ঘরবাড়ি ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীতীর রক্ষা বাঁধও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
বালু উত্তোলন ঘিরে সংঘাত, প্রাণহানি
নিকলীতে নদী থেকে বালু উত্তোলন ঘিরে ঘটেছে একাধিক সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা। উল্লেখ্য, গত ১৯ জুলাই ঘোড়াউত্রা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছাতিরচর ইউনিয়ন বিএনপির তিন নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি কাছুম আলী (৬৫) নিহত হন। এ ঘটনায় আরও দুইজন আহত হয়েছিলেন।
এ ছাড়াও গত বছরের ১২ আগস্ট নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে বিরোধের জেরে বিএনপি ও যুবদলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। নিকলী সদর ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন এবং উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আজহারুল হক সোহেলের সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষে অন্তত দশজন আহত হন।
একজন নিহত ও একাধিক আহতের ঘটনার পরও থেমে নেই বালু উত্তোলন।
অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না উত্তোলন
প্রশাসন অভিযান চালিয়ে মাঝেমধ্যে ড্রেজার ও শ্রমিক আটক করলেও তাদের পরিচয় মেলে দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা হিসেবে। সিন্ডিকেটের মূল সদস্যরা নিজেদের আড়ালে রেখে ভাড়ায় ড্রেজার ও শ্রমিক এনে বালু তোলায়, অভিযানে কেবল ভাড়াটে শ্রমিক ও ড্রেজার জব্দ হয়, নেপথ্যের মূল হোতারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও সেই অর্থ পরিশোধ করে দেয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিজেই, আর কয়েক দিন পর একই ড্রেজার আবার নদীতে নেমে পড়ে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
নিকলী উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রনি আহম্মদ গত ২৪ জুলাই শুক্রবার দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুকে লেখেন, নিকলীতে বালু উত্তোলন নিয়ে হত্যাকাণ্ডের পর পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলেও আবার রাতের গভীরে গোড়াউত্রা নদীতে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে, এবং প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরে এর শেষ দেখে ছাড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে রনি আহম্মদ বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে সৃষ্ট অরাজকতা থেকেই একটি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রশাসন জড়িত না থাকলে সিন্ডিকেট এত সাহস পেত না। তথ্য দেওয়ার পরও প্রশাসন দায়সারা আলাপ করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমনকি ড্রেজার চালানোর সংবাদ জানাতে এসিল্যান্ডকে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি বলে জানান।
নিকলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. কফিল উদ্দিন বলেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নন। কিছু নব্য বিএনপি স্থানীয় প্রভাবশালী ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এ কাজ করছে। তিনি বলেন, বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করেছেন এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে বিএনপি দায়ী নয় বলে জানান।
নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ বদরুল মোমেন মিঠু বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে দলীয় পরিচয় থাকলেও তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হবে না, বরং সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের নাকের ডগায় হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার পরও ড্রেজার সামগ্রিকভাবে বন্ধ না হওয়াকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সাথে তিনি সতর্ক করেন, অবৈধ বালু উত্তোলন চলতে থাকলে লোভ-লালসা বেড়ে খুনখারাবির মতো ঘটনা আরও বাড়বে। গত বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
প্রশাসনের বক্তব্য
নিকলী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ শহীদ উল্লাহ প্রশাসনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিকলীতে সরকারি কোনো বালুমহাল নেই এবং নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন তৎপর রয়েছে বলে জানান তিনি।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেলেই অভিযান পরিচালনা করা হয়, তবে রাতের আঁধারে এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সম্প্রতি অভিযোগ কম আসায় মনে হচ্ছে উত্তোলন বন্ধ রয়েছে, তবে অভিযোগ পাওয়ামাত্র অভিযান চালানো হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

