বছইরা কামলা—হাওরাঞ্চলের শ্রমজীবনের অমলিন পটভূমি

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু নদী ও বন্যার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের জীবিকা ও সংগ্রামের অনন্য ইতিহাস। একসময় গোবরের লাকড়ি, খরস্রোতা নদীতে জেলেপেশা, কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ—এসবের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক পেশাই আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই হারানো ঐতিহ্য ও টিকে থাকা সংগ্রামের গল্প নিয়ে শুরু হয়েছে নিকলীকেন্দ্রিক প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর ধারাবাহিক ফিচার প্রতিবেদন—“হাওরাঞ্চলের ব্যতিক্রমী জীবিকা”। আজ থাকছে “বছইরা কামলা—হাওরাঞ্চলের শ্রমজীবনের অমলিন পটভূমি”

মোহাম্মদ তোফায়েল আহছান ।।

কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলকে ঘিরে যে সমাজব্যবস্থার উন্মেষ, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃষি। এখানকার ভূপ্রকৃতি—বর্ষায় জলমগ্ন বিস্তীর্ণ হাওর আর শুষ্ক মৌসুমে উর্বর কৃষিজমি—মানুষকে যুগযুগ ধরে কৃষিকেই প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য করেছে। বর্ষার পানি ধীরে ধীরে নেমে গেলে দেখা দেয় বিস্তৃত সবুজ ফসলক্ষেতের সম্ভাবনা। নরম কাদামাটির বুকে প্রথমে বোনা হয় ধানের চারা। এরপর ভুট্টা, বাদাম, তিল, ধনে, সরিষা—এমন নানান শস্যের আবাদে পুরো কৃষিভূমি রঙিন হয়ে ওঠে সময়ের ফসলচক্রে। হাওরের মাটির বিশেষ গঠন, প্রাকৃতিক পলি ও মৌসুমি জলবায়ু এসব শস্যের উৎপাদনে বাড়তি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে বছরের প্রায় আট থেকে নয় মাসই চলে নানান ধরনের কৃষিকাজ—মাটি তৈরি থেকে শুরু করে বপন, সেচ, নিড়ানি, সার প্রয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত ফসল সংগ্রহ।

এ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সাথে সমান্তরালে হাওরের মানুষের জীবনে গড়ে উঠেছিল পশুপালনকেন্দ্রিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। বর্ষায় ডুবে থাকে চরাঞ্চল, আর শুষ্ক মৌসুমে যখন খোলা মাঠ হয়ে ওঠে তখন সেখানে গরু–ছাগল পালনের সুবিধা থাকায় প্রায় প্রতিটি গৃহস্থই কোনো না কোনো পশু লালন-পালন করতেন। গবাদিপশুর দুধ, গোবর, বাছুর—সবকিছুই কৃষি ও পারিবারিক স্বনির্ভরতার অন্যতম সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়। মৌসুমি সবজি চাষ যেমন শীতকালে বাড়তি আয়ের উৎস, তেমনি গরু-ছাগল পালনও হয়ে ওঠে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর বছরের পর বছর স্থায়ী ভরসা। কৃষি ও পশুপালনের এই দ্বিমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে হাওরাঞ্চলে তৈরি হয়েছে এক স্বতন্ত্র কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি—যেখানে শ্রম, প্রকৃতি, মৌসুমি জলচক্র এবং মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক বিশেষ জীবনধারা।

শ্রমিকের স্থানীয় পরিচয়: ‘মুনি’ বা ‘কামলা’
হাওরাঞ্চলের কৃষিকাজ কখনোই শুধু পরিবারের সদস্যদের শ্রমে টেকসইভাবে সম্পন্ন করা যেত না। ধান চাষ, ভুট্টা বপন, শস্য তোলা থেকে শুরু করে প্রতিদিনের গরু-ছাগল দেখাশোনা—সব মিলিয়ে কাজের চাপ ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত ও শ্রমনির্ভর। বর্ষাকাল শেষে ডুবন্ত হাওর যখন ভাসতে শুরু করতো, তখন চর বা উঁচু জমিতে গরু-ছাগল চরানো, দুধ সংগ্রহ, বাথানে থাকা—এসব বিষয় আবার বাড়তি দায়িত্বের সৃষ্টি করত। ফসলের মৌসুম ঘনিয়ে এলে বাথানে রাতের পর রাত জেগে পাহারা দিতে হতো; গৃহস্থের কেউ অসুস্থ হলে বা দীর্ঘসময় বাড়ির বাইরে থাকলে সম্পূর্ণ কৃষিকাজই থমকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। এ কারণে কৃষক পরিবারগুলো নিজেদের শ্রমের পাশাপাশি নির্ভর করত চুক্তিভিত্তিক শ্রমশক্তির ওপর। আর এ শ্রমশক্তি বা শ্রমিকদের স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘মুনি’ বা ‘কামলা’—যারা হাওরের মাঠ, খামার, বাথান এবং গৃহস্থের দৈনন্দিন কৃষিকাজে ছিল অপরিহার্য সহকারী।

এই মুনি বা কামলা নেওয়ার প্রচলিত রীতিও ছিল দুটি সুস্পষ্ট ধাঁচে বিভক্ত। প্রথমটি দৈনিক মজুরির শ্রমিক, যাদের কাজ শুধুমাত্র প্রতিদিনের নির্ধারিত কৃষিকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। আর দ্বিতীয়টি ছিল আরও দীর্ঘমেয়াদি, আরও দায়িত্বপূর্ণ এবং সম্পর্কনির্ভর এক শ্রমব্যবস্থা—যা স্থানীয় মানুষ ‘বছইরা কামলা’ বা ‘বছইরা মুনি’ নামে জানত। এই দুই ধরনের শ্রমিকের উপস্থিতিই হাওরের ঐতিহ্যিক কৃষি-সমাজকে বছরের পর বছর ধরে সচল রেখেছে, আর তাদের শ্রম ও ভূমিকা কৃষিভিত্তিক পারিবারিক অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

দৈনিক মজুরির শ্রমিক: দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের প্রধান দায়িত্ব ছিল ক্ষেতের কাজ। তারা সকালে কাজে নামত, সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে ফিরে যেতো। তাদের কাজের পরিধি মূলত ক্ষেতকেন্দ্রিক—হালচাষ, ধান বা সবজি বপন, নিড়ানি দেওয়া, সার প্রয়োগ, ফসল তোলা ও সংগ্রহ করা। প্রতিদিনের মজুরি কখনো দিনশেষে, কখনো কয়েকদিন অন্তর পরিশোধ করা হতো। মজুরির পাশাপাশি তিন বেলা খাবার দেওয়াও ছিল প্রথা। শ্রমিকদের জন্য আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী ধূমপানের জন্য বিড়ি বা হুক্কা দেওয়ারও প্রচলন ছিল; যদিও এটি ছিল কেবল সামাজিক অভ্যাস, স্বাস্থ্যসম্মত নয়। দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের অবস্থান ছিল প্রান্তিক—তারা মাঠে থাকতেন, দায়িত্ব সীমাবদ্ধ ছিল দৈনন্দিন শ্রমেই।

বছরমেয়াদি ‘বছইরা কামলা’: হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে সুসংগঠিত শ্রমব্যবস্থা ছিল বছরমেয়াদি চুক্তির শ্রমিক বা কামলা। স্থানীয়ভাবে এদের বলা হতো ‘বছইরা কামলা’ বা ‘বছইরা মুনি’। এরা ছিলেন মৌসুমি বা প্রায় বছরব্যাপী চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক। একটি পরিবারের কৃষিকাজ ও গৃহস্থালি পরিচালনায় এরা ছিলেন যেন বাড়ির বাইরে থেকেও সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সদস্য।

বছইরা কামলাদের চুক্তি হতো সাধারণত ৯ মাসের জন্য—কারণ হাওরের কৃষিচক্র বছরে প্রায় এতটা সময় ধরেই চলে। তবে যেসব গৃহস্থের গরু-ছাগলের সংখ্যা বেশি হতো, তাদের ক্ষেত্রে চুক্তির সময়সীমা বাড়ানো হতো অতিরিক্ত আলোচনার ভিত্তিতে। কৃষক পরিবার বা গৃহস্থের কৃষিকাজ ও গরু-ছাগলের পরিধি বিবেচনায় দরকার হতো এক বা একাধিক বছইরা কামলার।

চুক্তিভিত্তিক এসব বছরমেয়াদি শ্রমিকদের জন্য খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয়তার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। বাথান বা বসতঘরের আঙিনায় তাদের জন্য বরাদ্দ থাকত আলাদা রান্নাঘর বা চুলোর জায়গা, যেখানে প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও রাতে ভাত, ডাল, শাকসবজি, মাঝে মাঝে মাছ–মাংস রান্না করা হতো। সাধারণত ভোরে মাঠে যাওয়ার আগে শ্রমিকরা খেতেন গরম ভাত বা রুটি, সঙ্গে যেকোনো সহজপাচ্য তরকারি। মাঠের কাজের ফাঁকে দুপুরে খাওয়া হতো ক্ষেতের পাশে, ছাতার তলায় বা কোন বাথানের ছায়ায় বসে। সন্ধ্যায় ফেরার পর থাকত তুলনামূলক ভারী খাবার—চাওয়া-পাওয়া অনুযায়ী তরকারিতে বৈচিত্র্যও দেখা যেত। তাদের কাজের ধকল বিবেচনায় খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, যাতে সারাদিনের শারীরিক পরিশ্রম টিকিয়ে রাখা যায়। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকত—ফসল কাটার মৌসুমে গৃহস্থের বাড়ি থেকে আসতো পায়েস বা গুড়ের নানান মিষ্টান্ন, শীতকালে বাড়িতে বানানো শীতের পিঠা; এসব খাবার শ্রমিকদের সাথে পরিবারের সদস্যদেরও একাত্ম করে তুলত।

নিয়মিত খাবারের পাশাপাশি প্রতিটি বাথানে সব সময় মজুত রাখা হতো শুকনো খাবারের আলাদা ভাণ্ডার। কারণ মাঠে কাজের চাপ অনিয়মিত, কখনো গবাদি পশু চরানো বা অন্যান্য কৃষিকাজ তদারকিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, আবার কখনো দুপুরের আগেই প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগে যাওয়া—সব সময় নির্দিষ্ট সময়ে রান্নার খাবার পাওয়া যেত না। তাই এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ক্ষুধা নিবারণের জন্য রাখা হতো মুড়ি, চিড়া, গুড়, বাদাম ভাজা, কখনো হাতে বানানো নাড়ু। এগুলো রাখা হতো টিনের তৈরি বাক্সে, যাতে আর্দ্রতা ঢুকে নষ্ট না হয়। কামলারা ক্ষুধা অনুভব করলেই সহজেই এসব খাবার নিয়ে খেতে পারত। অনেক সময় দেখা যেত, মাঠে কাজের ফাঁকে শ্রমিকরা কোমরে ঝোলানো ছোট কাপড়ের থলি থেকে মুড়ি–গুড় বের করে খাচ্ছেন—এ ছিল হাওরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের খুবই পরিচিত দৃশ্য। মূলত এই শুকনো খাবারগুলোই তাদের দিনের নিরবচ্ছিন্ন শক্তির জোগানদাতা হিসেবে কাজ করত, আর বাথানের মালিকের দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক হিসেবেও বিবেচিত হতো।

বছরমেয়াদি শ্রমিকদের দায়িত্ব কেবল ক্ষেত-খামারের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এদের কর্মক্ষেত্রে ছিল দৈনিক মজুরি শ্রমিকদের তুলনায় কিছুটা বিস্তৃত—গৃহস্থ অনুপস্থিত থাকলে সমগ্র কৃষিকাজের মূল তদারকি, গরু-ছাগল পালন, খাওয়া-দাওয়া, পরিচর্যা, দুধ সংগ্রহ করে গৃহস্থের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া বা বাজারে বিক্রি করা, দৈনিক মজুরিদের উপস্থিতি দেখা, কাজের মান নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা গৃহস্থকে জানানো। এসব কাজে তারা প্রায় পরিবারের সদস্যের মতোই গুরুত্ব পেতেন। বিশ্বাস, আস্থা ও দীর্ঘ সম্পর্ক—এই তিনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল এই চুক্তি।

বছইরা কামলার আবাসন ও বাথান সংস্কৃতি
কৃষিকাজের পরিধি যত বিস্তৃত হতো, ততই অনেক গৃহস্থকে নদী–নালা পেরিয়ে দূরবর্তী চরাঞ্চলে গিয়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে হতো। এসব অস্থায়ী ঘরই স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল ‘বাথান’ নামে। সাধারণত বাথান তৈরি করা হতো তুলনামূলক উঁচু জমির ওপর। যাতে বর্ষা আসতে শুরু করলে বেশি সময় ধরে ঘরটি ঠিক থাকে। বাঁশ, খড় কিংবা টিন আর শক্ত দড়ি দিয়ে তৈরি এই ঘরগুলো ছিল সরল কিন্তু কার্যকর। একেকটি বাথানে আলাদা রান্নার ব্যবস্থা, গবাদিপশুর খোপ, অবসরে বসে গল্প করার জন্য বাঁশের মাচা থাকতো।

গবাদিপশু থাকার জন্য উপযুক্ত করে রাখা হতো। গবাদিপশুরা বাথানের ফেরার পর রাতের খাবার কিংবা পানি দেয়ার জন্য রাখা হতো বালু ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বড় আকারের গামলা। বাথানের ভেতর শক্তপোক্ত মাচা বানিয়ে তার ওপর বিছানা বিছিয়ে থাকতেন বছরমেয়াদি শ্রমিকরা। একটি বাথানে সব সময় একই গৃহস্থের একজন শ্রমিকই থাকতেন না। আলোচনাসাপেক্ষে একাধিক গৃহস্থ পরিবারের নিয়োজিত শ্রমিকরা একসাথে থাকতেন। এতে পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতা, গল্প করার জন্য নির্ভরযোগ্য সঙ্গীও পাওয়া যেত। বিশেষ নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে রাতের বেলায় পালাক্রমে বাইরে রাখা মাচায় বসে পাহারার কাজ করতেন শ্রমিকরা।

এমন পরিবেশেই বছরমেয়াদি শ্রমিক—বছইরা কামলা বা মুনিরা—বাথানে থেকে কৃষিকাজ, পশুপালন এবং দৈনন্দিন কাজের সব দায়িত্ব সামলাতেন। ভোরে প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তারা বের হয়ে যেতেন ধানের জমি দেখতে, গরু–ছাগলকে চরাতে বা গোয়ালে খাদ্য দিতে। পুরো দিনজুড়ে জমির বাঁধ মেরামত, খেত পরিষ্কার, পানি নামা–ওঠার হিসাব রাখাসহ অসংখ্য খুঁটিনাটি দায়িত্ব পালন করতে হতো তাদের। বর্ষার সময় পানি যখন হঠাৎ বাড়ত, তখন বাথান রক্ষার জন্য রাত জেগে পাহারা দেওয়া, পশু সরিয়ে নেওয়া বা খড়–কাঁটা বেঁধে ঘর মজবুত করার কাজও তাদের ওপরই নেমে আসত। বর্ষার পানি আসতে শুরু হলে বাথানের অবস্থান পরিবর্তন করতে হতো—বাথান ভেঙে লোকালয়ে সরিয়ে আনা ছিল তখনকার বাস্তবতা। হাওরের অনিশ্চিত প্রকৃতির মাঝেও তাদের শ্রম আর অভিজ্ঞতার ওপরই নির্ভর করত পুরো বছরের ফসল ও গবাদিপশুর নিরাপত্তা।

হাওরের বুকে বাথান জীবনে বছইরা কামলাদের স্মৃতিকথা (পুনঃলেখন)
রহিম মিয়া শোনালেন বাথান জীবনের প্রথম রাতের অভিজ্ঞতা আর হাওরের পাঠশালার কথা—আমার বয়স তখন সবে পেরিয়েছে ষোলো। গ্রামে সবাই বলত—“এই ছেলেটা কাজ জানে, দায়িত্ব নিতে পারে।” সেই কথার ওপর ভর করেই এক গৃহস্থ চাচা আমাকে প্রথমবার বছরমেয়াদি মুনি হিসেবে নিলেন। হাওরের বাথানের দিকে প্রথম যাত্রার কথা আজও মনে আছে। ঘোড়াউত্রা নদীর পশ্চিম পাড় থেকে নৌকা যখন চরের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই অনুভব করলাম—চারদিকে অসীম কৃষিজমি, মাঝে মাঝে কয়েকটা বাথান ঘর, বাতাসের শো শো শব্দ আর মৃদু ঘাসের গন্ধ। নৌকা থেকে নামতেই গায়ে একটা ঝাঁকুনি খেলে গেলো। ছোটকাল থেকে দেখতে দেখতে বেড়ে ওঠা এই চর-বাথান আমার কাছে মনে হচ্ছিল নতুন অন্য এক জগৎ।

সেই রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙল গরুর ডাক আর চিকন গুমোট শব্দে। মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবীটাই যেন ভেসে আছে। সাথে আমিও উড়ে বেড়াচ্ছি। মনে অজানা এক ভয়! অতি দীর্ঘ এক রাত পেরিয়ে ভোর হলো। দায়িত্ব পেলাম সব গরু সামলানোর। গৃহস্থ চাচা বলেছিলেন—“রহিম, ভোর হলেই তুই আগে গরুগুলোকে দেখবি।” সেই প্রথম রাতেই বুঝে গেলাম—বছইরা কামলা হওয়া মানে শুধু শ্রম নয়, এটা হচ্ছে সাহসের পরীক্ষা, দায়িত্বের ভার খাঁটি করে বয়ে নেওয়া।

দিন–রাত মিলিয়ে কাজ শিখেছি মাটির কাছ থেকে। সকালে গরুগুলো অনাবাদি জমিতে চরিয়ে দিয়ে ধানের জমি দেখা, দুপুরে ক্ষেতের আইলে বসে কোনো মতে খাবার খাওয়া, সন্ধ্যায় পশুকে গোয়ালে তোলা, রাতে পাহারা দেওয়া। বাথানে সব সময় রাখার জন্য টিনভর্তি করে মুড়ি–চিড়া–গুড় চাচা দিয়ে গিয়েছিল। এই ঘরে আরো দুইজন থাকতো আগে থেকেই। আমরা তিনজন কামলা সেই বাথানে বসে প্রথম দিন খিচুড়ি খেয়েছিলাম। সেই খিচুড়ি স্বাদ—আজও মনে পড়লে বুকের ভেতর কী এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।

একবার মাঝরাতে ঝড়-তুফান শুরু হয়। অন্ধকার, বিজলির চমক, দূরে বজ্রপাতের শব্দ—সব মিলিয়ে ভয়ানক অভিজ্ঞতা। আমরা তিনজন মিলে গরুগুলোকে দেখে নিয়ে আবার মাচায় উঠে যাই। মনে মনে সবাই দোয়া-দরুণ পড়তে থাকি। ভোরে যখন আলো উঠল, সামনে দাঁড়িয়ে বাথানটা দাঁড়িয়ে আছে দেখে মনে হয়েছিল—আমরা যেন নতুন জীবন আর সাজানো আশ্রয় ফিরে পেয়েছি।

চুক্তির সময় শেষে গৃহস্থ চাচা আমার হাতে ধান আর কিছু টাকা তুলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন—“রহিম, তোর মতো কামলা খুব কম পাওয়া যায়।” ওই মুহূর্তে বুঝেছিলাম—বছরটা শুধু কাজের ছিল না, এটি ছিল মানুষের বিশ্বাস অর্জনের এক পাঠশালা।

কুদ্দুস মুনির বছইরা কামলা হিসেবে শেষ মৌসুমের গল্পকথা—আমি প্রায় আট বছর বছইরা কামলা হিসেবে কাজ করেছি। শুরুতে কাজ আর দায়িত্ব বুঝতাম না; কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম—বছইরা কামলা হওয়া মানে গৃহস্থের ছায়া হয়ে ওঠা। গৃহস্থ সব সময় চাষাবাদের কাজের জন্য নেওয়া রোজিন্দা কামলাদের দেখভালের জন্য থাকতেন না। তিনি না থাকলে আমার বাড়তি কাজ হতো—কোন কামলা ঠিকমতো কাজে এলো, কোন জমিতে সেচ লাগবে, কোন আইল দুর্বল হয়েছে, কোন জমিতে নিড়ানি লাগবে, সার দেয়া লাগবে—এগুলো তদারকি করা।

বাথানে আমাদের আলাদা এক জগৎ ছিল। দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাথানের সামনে বসলে পশ্চিম আকাশের লাল হয়ে আসা দেখতে ভালো লাগত। ফলানো ফসল বাতাসে দুলুনির ঘর্ষণে মধুর এক সুর ভেসে আসতো। আশপাশের বাথানের সবাই মিলে গানের আসর বসাতাম। কেউ বাঁশি হাতে সুর তুলতো, কেউ আঙুলের আঘাতে খঞ্জনিতে মাতোয়ারা, গলায় ধরতো আঞ্চলিক গান। এই গানের আড্ডাটি আমাদের সারা দিনের ক্লান্তি দূর করে দিতো। পরস্পরকে আরো অনেক ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ করতো। খুঁজে পেতাম আসল বন্ধুত্ব।

হাওরের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি ছিল অনেক সমস্যাও—কখনো ডাকাতের ভয়, কখনো নিজের অসুস্থতা, আবার কখনো গরু-ছাগলের অসুস্থ হওয়া। যত কঠিন পরিস্থিতিই আসতো না কেন, তাৎক্ষণিক সহযোগিতা বা সমাধানের সুযোগ ছিল না। চিকিৎসা সেবা নিতে হলে বহুদূরের পথ পাড়ি দিতে হতো। সব মিলিয়ে হাওরের বাথান জীবন উপভোগ্য ছিল। আমরা টিকে ছিলাম, কারণ হাওরের প্রতি ছিল অদ্ভুত এক টান। মনে হতো, আমরা শুধু শ্রমিক নই—আমরাই হাওরের জমি আর পশুর অভিভাবক।

কিন্তু সময় বদলায়। শেষ কয়েক বছরে দেখলাম এলাকায় ধীরে ধীরে ধান কাটার মেশিনসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক সরঞ্জাম আসছে। ডাকাতির ভয়ে গৃহস্থরা গবাদিপশু পালন কমিয়ে আনছে—যেসব কাজ মূলত বছইরা কামলারা দেখভাল করতো, সেগুলো কমতে শুরু করেছে। আগে যেখানে দশজন কামলা লাগত, এখন দুই ঘণ্টায় মেশিন সব শেষ করে। একটা কৃষি মৌসুম শেষে একদিন গৃহস্থ চাচা বললেন, “কুদ্দুস, জমিজমা, গরু-ছাগল পালনের জন্য তো এখন আর বেশি মানুষ লাগে না। আগামী বছর থেকে আর তোরে রাখতে পারবো না।” তার কথায় কষ্ট লেগেছিল, কিন্তু রাগ হয়নি। বুঝতে পারছিলাম—হাওরের জীবন পাল্টে যাচ্ছে, আমাদের কাজগুলো আর প্রয়োজন পড়ছে না।

আমার শেষ মৌসুমে বাথান যেমন ছিল, তেমন আর কখনও দেখা যায়নি। প্রথম প্রথম কয়েক বছর কষ্ট লেগেছিল বাথানের জীবনের কথা মনে পড়ে। তবে বাথান এখনো আছে, পাল্টে গেছে সেই সময়ের ব্যবস্থাপনা, জীবনযাপন। হাওরে বাথানে থেকে এখন বেড়েছে হাঁস-মুরগি পালন, গরুর খামার—যারা এই ব্যবসা করে নিজেরাই দেখভাল করে, লোকজনও কম লাগে। আমি এখন বাজারে কাজ করি।

শফিকুলের ছেলেবেলার বাথান আর হারিয়ে যাওয়া এক প্রথা—আমি যখন প্রথম বাথানে যাই, তখন আমার বয়স মাত্র চৌদ্দ। বাবা অসুস্থ, সংসারে অভাব—তাই আমাকে যেতে হয়েছিল বছরমেয়াদি কামলা হয়ে। তখন বুঝতাম না, কিন্তু এখন অনুভব করি—হাওর আমাকে বড় করেছে, শিখিয়েছে প্রতিটি কষ্টের মূল্য।

আমাদের বাথান ছিল নদী পেরিয়ে দূর এক চরাঞ্চলে, বরুইল্লা বন্দে। বর্ষায় সেটা হয়ে যেত অথৈ পানিতে তলিয়ে যাওয়া “সমুদ্র। আর শীতে মাটির ওপর ছড়ানো বিশাল জমি। রাতে বাথানের মাচায় বসে আমরা খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। লোকালয় আর হাওরের বাথান জীবনের ছিল একটাই সাদৃশ্য, খোলা আকাশ।

সেই জীবন এখন বদলে গেছে। আজ যখন বাজার–ঘাটে কাজ করি, মাঝে মাঝে নদীর ধারে দাঁড়াই। বাতাসে যখন চিরচেনা সেই ধানগাছের খসখস শব্দ আর ঘ্রাণ ভেসে আসে, তখন মনে হয় আমি আবার সেই বাথানের উঠোনে হাঁটছি—খড়ের চালা, গরুর ডাক, কুয়াশার ভেতর ভোরের আলো… সব যেন জেগে ওঠে। মনে হয়, আমি একটা হারিয়ে যাওয়া যুগের মানুষ—যে যুগকে আজ কেউ আর মনে রাখে না।

বছইরা কামলায় আস্থা, গৃহস্থের স্মৃতিকথা
গৃহস্থ আব্দুস সাত্তারের বর্ণনায় মমিনের কাজের দিন যেন ছবির মতো ভেসে ওঠে—আমার বয়স তখন চল্লিশের কাছাকাছি। সংসারে তিন মেয়ে, এক ছেলে। জমি ছিল বেশ; কিন্তু সবকিছু একা সামলানো অসম্ভব। তাই বছরমেয়াদি কামলা নিই—১৬ বছরের মমিন। প্রথম দিন যখন তাকে বাথানে নিয়ে গেলাম, মনে হচ্ছিল যেন নিজের আপন কাউকে কাজ শিখতে দিচ্ছি। সে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছিল—অসীম কৃষিভূমি, মাঝখানে টিনের দুইচালা আমাদের অস্থায়ী ঘর, বাথান। আমি তাকে বলেছিলাম, “এই বাথানটাই আমাদের বাড়ি। গরু–ধান–কামলা—সব তোমার ওপর ভরসা।”

মমিন আমার প্রত্যাশার থেকেও বেশি দায়িত্ব নিল। মাঝে মাঝে আমিও ওর সাথে বাথানে থাকতাম। দেখতাম, হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে সে দৌড়ে গিয়ে গরুগুলোকে নিরাপদ জায়গায় এনে বেঁধে রাখত। পাকা ধান শুকানোতে আমার হাত ব্যস্ত থাকলে সে নিজে থেকে বাকি কামলাদের তত্ত্বাবধান করত—চুপচাপ, কোন অভিযোগ ছাড়াই। একদিন খেয়াল করলাম, সে রাতের অর্ধেকটা সময় জেগে কাটিয়েছে—কারণ অন্য বাথানে কিছু একটা হইচই শুনতে পেয়েছে। নিজের বাথানের নিরাপত্তার কথা ভেবে কান খাড়া করে সতর্ক থাকলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ঘুমাস না কেন?” সে হেসে বলল, “আপনের গরু আছে, আপনি আছেন, কীভাবে ঘুমাই?”

সেই ছেলেটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল কাজের চেয়েও বেশি। একদিন তার বাবার অসুস্থতার খবর শুনে আমি বাড়ির উঠানে বসে তাকে বলেছিলাম, “চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা আগেই নিয়ে যা। তারপর অনেকটা জোরাজুরি করেই কিছু টাকা দিয়েছিলাম।” সে নিতে চায়নি। বলেছিল, “কাজের শেষে নিলেই ভালো।” সেই ৯ মাস শেষে যখন তাকে চুক্তির পুরো টাকা, ধান আর কিছু উপহার দিলাম, কোনো মতেই চুক্তির পুরো টাকা নেবে না! আমি বুঝালাম, আমার সমস্যা তোর, তোর সমস্যাও তো আমার। ওটা আমার পরিবারের মানুষ মনে করেই চিকিৎসার জন্য দিয়েছিলাম।

আমার স্ত্রী বলেছিল—“ছেলেটা যেন আমাদের সংসারের কেউ।” সত্যি বলতে, আমি শুধু একজন কামলা পেলাম না—আমি পেলাম একজন বিশ্বস্ত মানুষ, যার ওপর ভরসা করলে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়। আজও হাওরের জমি দেখভালের জন্য এলে মনে পড়ে যায় মমিনের সেই শান্ত চোখ। চাষবাষের সব খুঁটিনাটি ও নিজেই সামলাতো। যান্ত্রিকতা এসেছে, কাজ বদলেছে; কিন্তু এমন একজন মানুষের অভাব আজও অনুভব করি—যে চুক্তির চেয়েও বেশি করে হৃদয়ের জায়গা দখল করে নেয়।

গৃহস্থ মফিজ উদ্দিনের অভিজ্ঞতায় একজন বিশ্বস্ত রুবেল—“ঘরের ছেলে” হয়ে ওঠার গল্প (পুনঃলেখন): আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কৃষি মৌসুম ছিল সেটি। তখনই কাজ শুরু করে রুবেল—একজন বছরমেয়াদি কামলা। বয়স তার বিশের কাছাকাছি, চেহারায় সাদামাটা, কিন্তু চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা। শুরু থেকেই বুঝলাম—এই ছেলে শুধু শ্রম দেবে না, পুরো কৃষিকাজের দায়িত্ব নেবে।

সেই মৌসুমে একদিন হঠাৎ রুবেল খবর পাঠাল, “চাচা, কিছু কিছু ধানক্ষেতে পানি ঢুকতেছে। পুরোপুরি পাকেওনি। কী করবো ভাবতে পারছি না।” শুনে তাড়াহুড়ো করে চরে যাই। আমার আগে অনেক গৃহস্থই সেখানে পৌছে গেছে। সবার মাঝেই আতঙ্ক, কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। রুবেল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাল, চাচা যে যাই করুক, আমরা যত দ্রুত সম্ভব ধান কেটে ফেলব। ওর পরামর্শে পরের দিনই কাটার জন্য দাওয়াল নিয়ে শুরু করে দেই। আমরা সবার আগেই শুরু করায় তুলনামূলক সহজে ধান কাটা শেষ করতে পেরেছিলাম, যদিও শেষের দিকে কিছু ধান পানিতে ভাসিয়ে নিয়েছে। অন্য অনেক কৃষক সে বছর ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়েছিল। তার এই ভরসা ছিল আমাদের প্রাণ।

চুক্তির শেষ দিনে আমি তাকে বললাম—“পরের বছরও থাকবি?” রুবেল একটু থমকে দাঁড়িয়ে, চুলের ওপর হাত বুলিয়ে হাসল—“চাচা, থাকলে ভালো লাগতো। কিন্তু বাবার শরীরটাও ভালো না। মা একা সামলাতে পারে না। আমাকে ঘরে ফিরতেই হবে।”

সে মুহূর্তে বুকের ভেতর কেমন জানি এক শূন্যতার ঢেউ লাগল। পুরো মৌসুমে যে ছেলেটা আমাকে যেন ছায়া দিয়ে রেখেছিল, সেই মানুষটা আগামী বছর থাকবে না—এই চিন্তা মেনে নিতে পারছিলাম না। তবু তাকে কিছু বলিনি। শুধু ওর হাতে ৯ মাসের চুক্তির টাকা, নতুন কাপড়চোপড়ের জন্য কিছু বাড়তি টাকা, বাড়ির লোকজনের জন্য কিছু উপহার আর বউয়ের হাতে বানানো কিছু পিঠা তুলে দিলাম। আমি যখন টাকাটা এগিয়ে দিচ্ছি, রুবেল হাত-পা কাঁপিয়ে বলে উঠল—“চাচা, এইটা একটু বেশি হয়ে গেল না? যে হিসেব ছিল তার থেকেও বেশি!”

আমি হাসলাম—“হিসেবের বাইরে যে দিনগুলো তুই আমার পাশে দাঁড়াইছিস, সেগুলা তো আর টাকা দিয়ে মাপা যায় না। সেই ভরসাটা একটা পরিবারের মতো।”

ওর বাড়ি ভিন্ন গ্রামে। আমাদের বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। সাথে করে নদীর ঘাটে যাই। নৌকায় উঠার আগে সে বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল। চোখে কেমন একটা কৃতজ্ঞতা, আবার অজানা অভিমান—সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক চাহনি। তাকে নামানোর পর নৌকা নদীর মাঝ বরাবর চলে গেলে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। মনে হচ্ছিল যেন কাউকে সত্যিকার অর্থেই হারিয়ে ফেললাম—একজন কামলা নয়, নিজের ঘরের কেউ।

আজও যখন ফসলের মাঠের দিকে তাকাই, মনে হয় রুবেল পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ কোনো জমিতে পানি ঢুকলে সে হয়তো বলবে—“চাচা, তাড়াতাড়ি কাজে নামি; দেরি করলে আমরা শেষ।”

প্রথার পরিবর্তন ও বিলুপ্তির পথে যাত্রা
সময়ের প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষিজীবনও। যে হাওর একসময় প্রায় পুরোপুরিই শ্রমনির্ভর কৃষিকাজের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন এসে জেগে উঠেছে নতুন বাস্তবতা। জলবায়ুর অনিশ্চয়তা এ অঞ্চলের কৃষিকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করেছে—হঠাৎ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আগাম পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া, কিংবা অস্বাভাবিক খরা—এমন পরিস্থিতি গৃহস্থদের বছরজুড়ে শ্রমিক রাখার সামর্থ্যকে দুর্বল করে দিয়েছে। গবাদিপশুর সংখ্যাও আগের তুলনায় কমে গেছে; অনেক পরিবারই এখন বড় পাল রাখার বদলে এক–দু’টি গরু–ছাগল নিয়ে সীমিত আকারে পালন করেন। ফলে বছরের পর বছর পশু দেখভাল ও ক্ষেত পাহারার মতো নিরবচ্ছিন্ন শ্রমের প্রয়োজনীয়তাও কমে এসেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যান্ত্রিক কৃষি সরঞ্জামের ব্যবহার—হাওরে এখন ট্রলি, ধান কাটার মেশিন, পাওয়ার টিলার, থ্রেসার মেশিন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একসময় মাঠে যেখানে ৮–১০ জন কামলা লাগত, এখন সেখানে কয়েকটি মেশিনই কাজ সারছে কয়েক ঘণ্টায়। যান্ত্রিকতার এই বিস্তার শ্রমনির্ভর কৃষিকাজকে ধীরে ধীরে সীমিত করে দিয়েছে। পাশাপাশি অনেক তরুণ শ্রমিক বিকল্প পেশায় ঝুঁকেছেন—বিদেশে শ্রমবাজার, স্থানীয় বাজার-ঘাট, মাছের আড়ত, পোশাক কারখানা, ড্রাইভিংসহ নানা ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় বছরমেয়াদি শ্রমিক হয়ে থাকার আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে।

বাথান প্রথাটিও আর আগের মতো টিকে নেই। নদী–নালা পেরিয়ে দূর চরাঞ্চলে অস্থায়ী ঘর তুলে থাকা এখন আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অনাকাঙ্ক্ষিত ডাকাতি, পশু চুরি, রাতের নিরাপত্তাহীনতা এবং বর্ষার অপ্রত্যাশিত পানি—সব মিলিয়ে বাথানে শ্রমিক রাখা গৃহস্থদের কাছে আর তেমন নিরাপদ নয়। ফলে বাথানের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেয়েছে বাথান-নির্ভর বছরমেয়াদি শ্রমিকের প্রয়োজনও।

ফলে যে প্রথা একসময় হাওরের কৃষির অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল—‘বছইরা কামলা’ বা বছরমেয়াদি মুনি—তা আজ ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। এখনো কিছু গৃহস্থ পরিবার সীমিত আকারে এই ধরনের শ্রমিক রাখেন ঠিকই; কিন্তু তা আগের তুলনায় অতি বিরল। স্থানীয় এলাকায় আর আগের মতো বছরমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের নিয়ে আলোচনা শোনা যায় না; বরং তা শুনলে আজ অনেকের কাছেই অতীতের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের মতো মনে হয়। এক সময়কার হাওরজীবনের অপরিহার্য অংশ ‘বছইরা কামলা’ তাই আজ দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতির ধুলায় মোড়া, হারিয়ে যাওয়া কৃষিসংস্কৃতির এক নিঃশব্দ প্রতীক হয়ে।

হাওরের সমাজ শুধুই জল–মাটি–ধানের গল্প নয়। এখানে আছে রহিমের সাহস, কুদ্দুসের ভ্রাতৃত্ব, শফিকুলের হারানো শৈশব, মমিনের বিশ্বস্ততা, রুবেলের মতো মানুষদের দায়িত্ববোধ। এরা সবাই শুধু শ্রমিক নয়—একটি প্রথার ধারক, একটি সময়ের অভিধান। আজ হয়তো তাদের আর “কামলা” বলে কেউ ডাকে না; কিন্তু হাওরের মাঠে যখন ভোরের কুয়াশায় সবুজ ধানগাছ দুলে ওঠে—তখন সেই পাতাদের মাঝে লুকিয়ে থাকে বছইরা কামলার ঘামের স্বাক্ষর, যেখানে প্রতিটি শস্যদানায় লেখা থাকে—“আমরা ছিলাম। আমরা এই মাঠেরই মানুষ।”

লেখক: সংবাদমাধ্যম কর্মী

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:
ফিচারে উল্লিখিত গৃহস্থ ও শ্রমিকদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
গৃহস্থ ও শ্রমিকদের বক্তব্যগুলো পুনঃলেখন করা।
ফিচারে ব্যবহৃত ছবিগুলো “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর নিজস্ব জনবল ব্যবহার করে তোলা হয়েছে।

Similar Posts

error: Content is protected !!