
ডা. রিপা চক্রবর্তী ।।
গর্ভকালীন সময়ে মা নিজের ও অনাগত সন্তানের যত্ন করেন। নিয়মিত সুষম খাবার ও ডাক্তারের পরামর্শে ফলিক এসিড, ক্যালসিয়াম, আয়রন আর ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নেন। ফলে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি ত্বক-চুল উজ্জ্বল ও মজবুত হয়ে উঠে। কিন্তু বাবুর জন্মের পর তার সঠিক দেখাশোনা নিশ্চিত করতে গিয়ে মা নিজেকে ভুলে যান। ফলে সুষম আহার, নিদ্রা আর যত্নের অভাবে নিষ্প্রাণ হয়ে চুল ঝরে পড়তে থাকে।
সন্তান জন্মদানের পর তাই চুল পড়াকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন ও চিকিৎসা নিন।
হরমোনাল কারণে চুল পড়ে
গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোনের মাত্রা থাকে অনেক বেশি। ডিম্বাশয়, প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল প্রভৃতি থেকে অনেক হরমোন বের হয়। সন্তানের জন্মের পর এ হরমোনের মাত্রা একেবারে হঠাৎ করে কমে যায়, তার ফলস্বরূপ চুল পড়ে।
নরমাল না সিজারিয়ান-কোনটায় চুল বেশি পড়ে?
নরমাল ডেলিভারি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তাই হরমোনের মাত্রা কমে স্বাভাবিকভাবে আর সিজারিয়ান সেকশন অপারেশনের পর হরমোনের মাত্রা হঠাৎ করে কমে যায়। তাই সিজারের পর চুল পড়ার আশঙ্কা বেশি।
ঘুম খুবই প্রয়োজনীয়
মায়ের ঘুম না হলেও চুল পড়ে। শিশুকে খাওয়ানোর জন্য রাতে বারবার মাকে উঠতে হয়, সারা দিন মাকে হিমশিম খেতে হয় শিশু সামলাতে, নিজের দিকে খেয়ালই রাখা যায় না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারেরই সদ্যপ্রসব করা নারীর তেমন খাওয়া-দাওয়াও হয় না। ফলে ঘুম হয় না। তখন চুল পড়ে।
রক্তস্বল্পতা আপনার শত্রু
রক্তস্বল্পতা একটি বড় সমস্যা। আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ মায়ের হিমোগ্লোবিন ১০ গ্রাম শতাংশের নিচে।
যত্ন করুন নিয়মিত
সন্তান গর্ভে থাকাকালীন এই যত্ন শুরু হওয়া দরকার। গর্ভাবস্থা ও বুকের দুধ খাওয়ানো—এই দুই অবস্থাতেই মেয়েদের স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় ক্যালরির ওপরে আরো ৩০০ থেকে ৫০০ ক্যালোরি অতিরিক্ত প্রয়োজন হয়। তাই প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট—সবই ঠিকমতো খেতে হবে। একবারে না পারলে বারবার অল্প অল্প করে খাওয়া দরকার। ফল ও দুধ খেতে হবে পর্যাপ্ত। আমাদের দেশে সন্তান হওয়ার পর দুধ, সাগু খাওয়ার যে প্রথা প্রচলিত আছে তা ক্যালোরির জোগান দেয়।
খুব বেশি তেল-মশলা দেওয়া খাবার এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া না খাওয়াই ভালো।

দুপুরের দিকে শিশুকে দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে যদি বাড়ির অন্য কোনো আত্মীয় বা পরিবারের অন্যান্য সদস্য এমনকি আপনার স্বামীর কাছে রেখে মা নিজে অন্তত দু-তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতে পারেন, তাহলে খুব ভালো হয়। দরকার হলে এ সময় শিশুকে খাওয়ানোর জন্য বুকের দুধ বের করে সঞ্চয় করে রেখে দেওয়া যেতে পারে।
সপ্তাহে দুদিন নন-মেডিকেটেড শ্যাম্পু দিয়ে মাথা ঘষে ফেলুন। রাতে শোয়ার আগে মাথায় লাইট হেয়ার অয়েল তুলোয় ভিজিয়ে নিয়ে ম্যাসাজ করুন অন্তত পাঁচ মিনিট।
নিন ডাক্তারের পরামর্শ
রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা অবশ্যই ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী করতে হবে। চিকিৎসা মানে ইচ্ছেমতো আয়রন বড়ি বা ক্যাপসুল খাওয়া নয়। কোন ওষুধ কার ক্ষেত্রে কার্যকর তা একমাত্র চিকিৎসকই বলতে পারবেন। এ ছাড়া দেওয়া হয় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট।
চুল গজানোর জন্য ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসক মাথায় স্টেরয়েড ড্রপ ম্যাসাজ করতে বলেন। তাতে খানিকটা কাজ হয়। তা ছাড়া মাথায় ভালোভাবে ম্যাসাজের জন্য রক্তসঞ্চালন বাড়ে, তাতে চুল গজায়।
একজন মা শুধু সন্তানকেই জন্ম দেন না, নিজেও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তাই সুস্থ পরিবার ও সুস্থ সন্তানের জন্যে মায়ের নিজের প্রতি মনো্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন ও সর্বদাই কাম্য।
লেখক : কনসালটেন্ট, ডেন্ট-আই, আজিমপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ

সূত্র : সন্তান জন্মদানের পর কেন চুল পড়ে, কী করবেন? [মেডিভয়েজ, ৭ মার্চ ২০১৮]

