হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ২০

শেখ মোবারক হোসাইন সাদী ।।

নির্দিষ্ট করে প্রেমের সংজ্ঞা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কিছু শাস্ত্র পাঠ করে প্রেমের ওপর লিখব। হাওরপাড়ের প্রেম এ শাস্ত্রগুলোর বাইরে।

প্রেম হল অন্য কোনো ব্যক্তির প্রতি কোনো ভালোবাসার অনুভূতি বা কোন দৃঢ় আকর্ষণ এবং এ সকল বিষয়ের ফলে সৃষ্ট আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক বিয়ের নিমিত্তে বিবাহপূর্ব সম্পর্ক গঠনকারী আচরণাবলী প্রকাশের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।[১]

যদিও প্রেমাত্মক ভালোবাসার আবেগ-অনূভূতিগুলো ব্যাপকভাবে যৌন আকর্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত; তবুও শারীরিক সম্ভোগের আশা ব্যতিরেকেও প্রেমানুভূতির অস্তিত্ব থাকতে পারে এবং পরবর্তীকালে তা সেভাবে প্রকাশিতও হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে প্রেম নামক পরিভাষাটি মধ্যযুগের অভিজাত নারীদের প্রতি নাইট সৈনিকদের প্রেমাবেগীয় মতবাদ হতে এসেছে যা মধ্যযুগের শিভালরিক প্রেমের সাহিত্যের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে।

প্রেম হল ভালোবাসার সাথে সম্পর্কিত একটি উত্তেজনাপূর্ণ, যৌনতাপূর্ণ এবং রহস্যময় অনুভূতি। এটি হল কোনো ব্যক্তির প্রতি যৌন আকর্ষণের সাথে সম্পর্কিত কোনো আবেগীয় আকর্ষণ হতে উদ্বুদ্ধ একটি বহিঃপ্রকাশমূলক ও আনন্দঘন অনুভূতি। গ্রিক চারটি আকর্ষণের মধ্যে এটি আগেপ, ফিলিয়া কিংবা স্টরজ-এর তুলনায় ইরোসের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানী চার্লস লিন্ডহোমের সংজ্ঞানুযায়ী প্রেম হল “একটি প্রবল আকর্ষণ যা কোনো যৌন-আবেদনময় দৃষ্টিকোণ হতে কাউকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে এবং যাতে তা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মনোবাসনাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।”[১] কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতে অপর ব্যক্তির প্রতি একই সাথে শক্তিশালী মানসিক এবং যৌন আকর্ষণ কাজ করে। প্রেমের সম্পর্কে যৌনতার তুলনায় ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি অধিক গুরুত্বের অধিকারী হয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্কসমূহের সূচনাপর্বে প্রেমের অনুভূতি অধিকতর দৃঢ়ভাবে কাজ করে। তখন এর সঙ্গে এমন এক অনিশ্চয়তা এবং দুশ্চিন্তা অনুভূত হয়[১] যে এ ভালোবাসা হয়তো আর কখনো ফিরে নাও আসতে পারে।

বলেছিলাম হাওরপাড়ের প্রেম নিয়ে আলোচনা করব, সেই সাথে অপেক্ষমান পর্বগুলোও। তাই প্রেম সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়ে রাখলাম, যদিও সেটা নেহাত বোকামী। তাও আমাকে তো আলোচনা করতেই হবে। আজকের পর্বে মূলত আলোচনা করব হাওরপাড়ের বেদের জীবন সংস্কৃতি নিয়ে।

চল বেদে চল,
ওরে চল বেদে চল
পদ্মা গাঙে তুফানী ঢেউ নাচত্যাছে খলখল।
মোরা ঘর বাঁধি না মাটির পরে উঠান মোদের জল,
রে বেদে, উঠান মোদের জল;
এদেশে থনে ও দেশ যেয়ে করত্যাছে টলমল।
কোন দেশেতে কোন খোড়ালে নাচত্যাছে সাপ খল।
এ নাচত্যাছে সাপ খল,
মানব জাতির শুত্রু এরা বিশেতে টলমল;
ওরে ফনা ধরে আনব টানি আমরা বেদের দল।
ওরে চল বেদে চল।

বেদেরা যাযাবর। তাঁরা একেক সময় একেক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। আগেকার সময় নৌকায় এদের বসবাস ছিল। তাই নৌকা করেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তারা যাতায়াত করতেন। নৌকাতেই তারা বসতি স্থাপন করতেন। বিভিন্ন অঞ্চলের মতো হাওরপাড়ের নিকলী (কিশোরগঞ্জ), হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট জেলায়ও বেদের বহর রয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলার সদর, নিকলী, ইটনা, মিঠামইন, করিমগঞ্জ, ভৈরব, অষ্টগ্রাম, বাজিতপুর, কটিয়াদী, তাড়াইল, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কুলিয়ারচরে বেদের বহর বছরের প্রায় সময় দেখা যায়। এছাড়া নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের রোদারপুড্ডা বাজারের বরোদার নদ তীরবর্তী বেশিরভাগ অংশ জুড়ে বেদে সম্প্রদায়ের বসবাস। এখানে বেদের শতাধিক পরিবার অস্থায়ীভবে বসবাস করছে। তবে এসব বেদের অধিকাংশই এখন পেশা বদল করে নানান পেশায় প্রবেশ করছেন। তবে সাপুড়েরা ভারতবর্ষে যে আাচার-সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করছে তা অন্যান্য দেখা যায় না।

“বেদেনীর প্রেম” নাটকের বিশেষ দৃশ্যে বেদেকন্যাকে প্রেম নিবেদন করছেন লেখক। (মডেল: তন্নী,বর্ষা ও বৃষ্টি)

বিশ্বের অনেক দেশেই সাপ ধরা পেশার সঙ্গে অনেকে জড়িত থাকলেও একমাত্র ভারতবর্ষেই সাপুড়েরা সাপের খেলা দেখানোসহ বিভিন্ন চিত্তবিনোদনের খোরাক জোগান দেন। এই ভারতবর্ষেই বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে অত্যন্ত দরদ দিয়ে; যা বাঙালী মাত্রই উদ্বেলিত। এই সাপের খেলা দেখানোর সময় বেদে-বেদেনীরা এক ধরনের সংগীত পরিবেশন করে থাকেন। সুদীর্ঘকাল থেকে এসব সংগীত মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। আর প্রচলিত এসব গান “বাইদানীর গান” বা “বেদে সংগীত” নামে পরিচিত হয়ে আসছে। প্রকৃত অর্থে এসব গান লোকসংগীত কিনা তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, এসব গান আমাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ বাংলা গানের ধারার এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বেদে-বেদেনীর সাপের খেলা দেখানোর সময় যেসব গান পরিবেশন করেন এর মধ্যে সংগৃহীত কিছু গান নিম্নরূপ-

আমরা বেদে বেদেনী
আমরা সাত ঘাটের জল পাড়ি দিয়ে
ভাসাই আশার তরণী।।

মোদের আছে নাগ নাগিনী
আমরা সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে
গাই সে সাপের গান ই।।

আমরা শিঙ্গা লাগাই
সাপের খেলা দেখাই
আমরা আনন্দ বিলাই
আমরা দিবাশেষে ঘরে ফিরি
ঘর যে মোদের তরণী।।

আমরা বেদে বেদেনী
আমরা সাত ঘাটের জল পাড়ি দিয়ে
ভাসাই আশার তরণী।।


গানটি লিখেছেন মোঃ জেহাদ উদ্দিন।

তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের বরোদার নদ তীরবর্তী বেদে বহর সর্দার মোঃ তাবারক হোসেনের কাছ থেকে। তাবারক হোসেনের কাছ থেকে সংগ্রহ করা আরো কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হলো।

বাপের বাড়ি যাবা তুমি
কোল সাপটা দ্যা ধরব আমি
গুর গুর বাইটা লো রায় রায়।

বেদে সর্দার তাবারক হোসেনের সাথে লেখক

“বিচিত্র জাত বেদেরা। জাতি জিজ্ঞাসা করলে বলে “বেদে”। তবে ধর্মে ইসলাম। আচারে পুরো হিন্দু; মনসাপূজা করে, মঙ্গলচণ্ডী, ষষ্ঠীর ব্রত করে, কালী-দুর্গাকে ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করে। হিন্দু পুরাণ-কথা তাদের কন্ঠস্থ। বিবাহ আদান-প্রদান সব দিক দিয়েই ইসলাম ধর্ম সম্প্রদায়ের সঙ্গে মেলে না; নিজেদের এই বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ। বিবাহ হয় “মোল্লার” কাছে ইসলামীয় পদ্ধতিতে। মরলে পোড়ায় না, কবর দেয়।”[২]

বেদের নিজস্ব কোনো ভাষা আছে কিনা তার খোঁজ করার চেষ্টা করেছি। কটিয়াদী থানার গচিহাটা রেলস্টেশনের পাশে যে বেদে বহর রয়েছে, এখানে কথা বলে কিছুটা ধারণা পাই। পরবর্তীতে ইন্টারনেটে সহায়তা নিয়ে আরো কিছুটা জানতে পারলাম। বেদেরা হাওরপাড়ের মানুষের সাথে বাংলায় কথা বললেও তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। নিজেদের মধ্যে তারা ঠেট বা ঠার ভাষায় কথা বলে থাকে। আগেই বলা হয়েছে, বেদেরা অস্ট্রাল গোত্রীয়। কিন্তু তাদের ভাষা তিব্বতি-বর্মি (সাক-লুইশ) ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এ ভাষার কোনো লিপি নেই। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ী ঠারভাষী বাংলাদেশি বেদের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।

সমাজকল্যাণ দপ্তরের জরিপ মতে, বাংলাদেশে শতকরা ৯৯ ভাগ বেদে মুসলিম। বেদেদের ধর্মাচার অবশ্য মিশ্র। অনেকে পীরের অনুসারী, আবার কেউ কেউ মনসা বা বিষহরির ভক্ত। ধর্মে সাধারণত বেদেরা ততটা আগ্রহী না। হিন্দু দেবদেবীর প্রশস্তি রচনা, বিভিন্ন পার্বণে অংশ নিলেও বেদেরা পূজা অর্চনা করে না। বাঙালি মুসলমানদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বিয়ে মুসলিম ধর্মীয় মতে হলেও বিয়ের আলাদা কিছু রীতি-নীতি আছে। গোষ্ঠীভেদে এসব রীতি-নীতির পার্থক্য দেখা যায়। আগের দিনে মারা গেলে তাদের লাশ কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হতো। এখনও তাদের মৃতদেহের ঠাঁই হয় কোনো পরিত্যক্ত স্থানে কিংবা নদীর কিনারায়।

বেদেরা কৌম সমাজের রীতি পালন করে আসছে শুরু থেকেই। তাদের জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন গোত্রের মধ্যেই আবদ্ধ। প্রতিটি বেদে পরিবারের ছিল নিজস্ব নৌকা। কয়েকটি নৌকা নিয়ে তৈরি হয় একটি দল। আর কয়েকটি দল নিয়ে একেকটি বহর। প্রতিটি বেদে বহরে একজন সর্দার থাকেন। বহরের নিয়মনীতি, প্রত্যেক দলের বাণিজ্যপথ ও এলাকা এসবই নির্ধারণ করেন সর্দার। বিয়ে এবং অন্যান্য উৎসবে সর্দারকে দিতে হয় অর্থ কিংবা বিশেষ উপহার।

বেদে সম্প্রদায়ের উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দারও আছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী বেদেরা ৮টি গোত্রে বিভক্ত। এই গোত্রগুলো হলো-
১. মালবেদে
২. সাপুড়িয়া
৩. বাজিকর
৪. সান্দার
৫. টোলা
৬. মিরশিকারী
৭. বরিয়াল সান্দা ও
৮. গাইন বেদে।

বেদেরা সাধারণত কার্তিক মাসের ৫ তারিখ থেকে অগ্রহায়ণের ১৫ তারিখ, এই সময়ের মধ্যে ঢাকার সাভার বা চট্টগ্রামে একত্রে মিলিত হয়। তখন সমস্ত বহরের নেতারা মিলে গোত্রীয় সর্দার নির্বাচন করে থাকেন। বেদে জনগোষ্ঠীর গোত্রপ্রীতি প্রবল। তারা আজও সমগ্র দেশজুড়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক রক্ষা করে চছে।[৩]

আগে বাইদ্যার সঙ্গ না করে
কালসাপিনী ধরতে গেলাম
সাহসের জোরে
ফণা ধরলো ছোবল মারলো
বিষে অঙ্গ কেমন।।
ওঝা বৈদ্যের কাছে গেলাম
কত শতবার
কিছুতেই আর শান্তি হয় না
দিল বেকারার
ডাক শোনে না মন্ত্র মানে না
ঝারলে বিষ উজান ধরে।।
বাইদ্যা যারা জানে তারা
সাপ ধরিবার ধরিবার কল
বাঁশির গানে ডেকে আনে
বাঁশিতে কৌশল
সাপিনী দেখিলে তারে
অমনি মাথা নত করে।।
পঞ্চরসে মাখা যে জন
শুদ্বাশান্ত হয়
কালসাপিনী দংশিলে
তার মরণের নাই ভয়
সে জানে সুধা কোথায় রস
খেয়ে যায় অমরপুরে।।
মায়াবিনী কালসাপিনী
এ করিম বলে
মহামন্ত্র না জানিলে
দংশ কপালে
গুরুবস্তু ঠিক থাকিলে
সে জন সাপ ধরতে পারে।।

গানগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে বেদে সর্দার কন্যা মরিম (২৫)এর কাছ থেকে। তার কাছ থেকে সংগ্রহ করা আরো কিছু তথ্য ও গান নিচে দেওয়া হল-

হাওরপাড়ের বেদেরা কৃষিকাজ বা অন্যান্য শারীরিক শ্রমকে অমর্যাদার মনে করে। মেয়েরাই প্রধানত কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে যায়। এই মেয়েরা এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছুটে বেড়ায়। তাদের আদি সার্বজনীন পেশা হলো কবিরাজি আর ভেষজ ওষুধ বিক্রি করা। এছাড়া ঝাড়ফুঁক, শিঙ্গা লাগানো (কাপিং থেরাপি), ব্যথা দূর করতে গরুর শিং দিয়ে রক্ত টেনে আনা, দাঁতের চিকিৎসা, বানর খেলা, যাদু দেখানো এসব কাজ করে থাকে। গোত্রভেদে কাজের ধরন আলাদা হয়ে থাকে। সাপুড়েরা সাপ ধরে, সাপের খেলা দেখায়। আমার সংগৃহীত কয়েকটি মন্ত্র নিচে দেওয়া হলো-

১. এসো মা স্বরসতি দাও মা স্মরণশক্তি নির্মন ও বরনে রক্তের বিবি সিতা কন্ডলো করনে গলায় গজমতি মুক্তোর হার মন্ত্র বিদ্যা সরন কর যাহার বিদ্যা তাহার পায় কোটি কোটি সমস্কার

২. কালা কালা বিষ কালা সিদুরের ফোটা হাড়ি ঝি কন্ঠের পরে না মানিস তুই বাধা *কাল কাটি কুল কাটি কাটি কুকিয়ান দেখিয়া খসিয়া পড়ে সাপের ও পরান *সাপা থাকে মুঠোর নিচে উচ্চ ভোরাটের দোহায় তোর শিবের রাগ্যে মাথা করিস হেট বানধিয়ান কুগিয়ান দুরে চলে যাস নয়লে শিবের পাঁচ মাথা কামড়ায়ে খাস নেই বিষ বিষো হরি রাগ্যে বলো নেই *নেই বিষ মনসার রাগ্যে বলো নেই

৩. বাঁধো ভুত জহাঁ তু উপজি ছিড়ো,গিয়ে পর্ ওয়ত্ চঢ়াঈ সগৈ দুহ্রেলী , পৃথ্ওয়ী তুজ্ভী ঝিলিমিলাহি হংকারে হনুবন্ত পচারই ভীমা জারী জারী,জারী ভস্ম করে জো চাঁপেসীঁউ

৪. ওঁ নমো নরসিংহায় কপিশ জটায় অমোঘ বীচা সত্ত বৃত্তান্ত মহোগ্রগুরূপায় ওঁ হ্লীং হ্লীং ক্ষাং ক্ষীং ক্ষীং ফট্ স্বাহা

৫. পদ্ম পাতা মনসা দেবী মা ফাতেমার অঙ্গ বাদি বিশ্ব জয়া বিশ্ব রমনী কোরানের বাক্য ধারনী
আলিফ মীম হরফের উপর দম করে অমুকের মন করলাম চুরি
ছাড়বে সে নিজ
আসবে অমুক আমার বাড়ি
অঙ্গে দিলাম মীম হরফ
অন্তরে মারলাম ছুরি
দোহায় লাগে অমুকের মেয়ে অমুক আয় আমার বাড়ি
বাক্যের দাপটে বাক্য লড়ে বাক্য যদি লড়ে চড়ে
দোহাই নবীর মাতা ফাতেমার পায়ে পড়ে
দোহাই, আল্লাহর দোহাই, দোহাই নবী-রাসূলগণের দোহাই।

৬. কালো হরি কৃষ্ণনের মাথায় সেচড় চুল
হাসিতে খেলিতে গেলেন কালি দহের কুল

কালিদহের কুলে ছিলো কালকৃরিন্দির গাছ তাহারো বারিতে ছিল চারখানা ডাল

কৃষ্ণের হাতের মোহন বাঁশি কদম তলায় থুয়ে ঝাপ দিল সব কালিদহের বিস্তলো বাহিরে যসধা রইলেন বসে বাছা কোথায় গেল কৃষ্ণের সরনে ও বিষ বিষ্ণো ক্ষেতে মইলো নেই বিষ বিষো হরি রাগ্যে বলো নেই
নেই বিষ মা মনসারো রাগ্যে বলো নেই।

এমন আরো অনেক মন্ত্র সংগ্রহ করেছি। কোন মন্ত্র কোন কাজে লাগে তা এখানে বলার অনুমতি পাইনি।

৭.
উত্তর বান্দুম পুব বান্দুম
পশ্চিম বান্দুম দক্ষিণ বান্দুম
পাতালে বাসুকি বান্দুম,
আকাশে ঠাট বান্দুম;
সামনে বাঘ বান্দুম;
পিছনে নাগেনী বান্দুম;

আমার এই বন্ধন করলাম সার ;
কারো মন্তর তন্তর যেন
আমার শরীরে না লাগে আর।

এ মন্ত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে বেদেকন্যা মরিয়মের মায়ের কাছ থেকে।

বেদেরা প্রাচীনকাল থেকেই পরোপকারী। তাই মানুষের উপকারের জন্য ওরা আগে থেকেই চিকিৎসাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছে। তাদের পেশাই যেমন চিকিৎসা। তাই তাবিজ-কবচ, ঝাড়ফুঁক, যাদু-টোনার মন্ত্র, সাপের বিষ নামানোসহ নানারকম রোগের হাতুড়ে চিকিৎসা তারা করে থাকেন। রাস্তাঘাটে চলাফেরার মধ্যে কোনো মরা পশু-পাখির হাড়গোড় দেখলেই তাদের ব্যাগে ভরে রাখে। যে কোনো মরা পশু-পাখির হাড়গোড় তাদের কাছে সবসময় সংরক্ষিত থাকে। এই মরা পশু-পাখির হাড়গোড়ই তাদের একমাত্র চালান। যেগুলো তাদের নিজস্ব “চিকিৎসাশাস্ত্রে” ব্যবহার করে থাকে। বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিভিন্ন উঁচু-নিচু গোত্রও আছে।

১. বন্ধন বন্ধন গুরুর চরন হয়ে একই মন
দিবানিশি পড়ে মনে ওই রাঙা চরন

রাঙা চরন বিনে মাগো অন্য নাহি জানি
কাল সাপ কাল কুটের বিষ ফুয়ে করলাম পানি
নেই বিষ বিষো হরি রাগ্যে বলো নেই
নেই বিষ মা মনসারো রাগ্যে বলো নেই।

২. মন্ত্র-
“ইয়া ছিন ছিন বা ছিন,
ইয়া জিন জিন তা জিন।
হক আল্লাহ সোবাহান আল্লাহ,
জিনকা বশি মিলাদিলা।
হু হু কাহাব্বু দোহায়
সোলেমান নবী কি,
হাজের শাও
হাজের শাও,
হাজের শাও।

৩. প্রেমিকাকে কাছে পেতে মন্ত্র-
বজ্জুতে বাজিয়ালে ধরা
ভৈরব নিয়ামুলে পাক
অমুকের আত্মায় টান পড়বে
কৌঞ্জ গৌরের নিবাক
ডানে বামে বন্ধন করি
বন্ধন করি অমুকের মন
নাভি মস্তকে চালনা ছারি
বন্ধন করি অমুকের দুই স্তন
শ্রীচমুন্ডা মাতার দোহাই
অমুক নিজ দেহ মন ছাড়
শবর গুরুকা বাক্যের দাপটে
মায়া ছাড় বাপ মার
বাক্যের দাপটে বাক্য লড়ে
বাক্য যদি না খাটে
দোহাই লাগে শ্রী-কৌঞ্জের
ভোলা শঙ্করের মস্তক ফাটে।

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৬৩৮ সালে বেদেরা আরাকান রাজ বল্লাল রাজার সাথে এ দেশে আসার পর বিক্রমপুরে প্রথম বসতি গড়ে তোলে।[৩] পরে সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে। বাংলাদেশের বগুড়া, পাবনা, ময়মনসিংহ, বাখরগঞ্জ, নোয়াখালিতে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের পাওয়া যায়। সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মিরসরাই, তিনটুরী; কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ; ফেনীর সোনাগাজী ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বেদের আবাসের কথাও জানা যায়। উল্লেখ্য, সাভারে যে বিশাল প্রান্তিক গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের অধিকাংশ নিজেদের “মান্তা” বলে পরিচয় দেয়। মান্তারা পেশায় মৎস্যজীবী। এদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মাচার বেদের মতোই। তবে সাগরসদৃশ হাওরপাড়েই তাদের অস্তিত্ব বেশি বেশি দেখা যায়।

নাট্যজন আতাউর রহমান খান মিলনের সাথে লেখক

১. ধর্ম চালম কর্ম চালম
সাপের মই টক চালক
আসা আসি কমন চালম
ধর্ম চালম কর্ম চালম।।

২. মোরা এক ঘাটেতে রান্ধী-বাড়ি
মোরা আরেক ঘাটেতে খাই
মোদের ঘরবাড়ি নাই
বাবু সালাম বারেবার।

৩. আমরা সব বেদের মেয়ে বাতের ব্যথা ভালো করি।
হয় যে রসিক সুজন বিনা ব্যয়ে পায় সে বড়ি।।
ঝোলাতে টোটকা রেখে পড়াতে বেড়াই ডেকে,
মনের মতন রোগী দেখে কোঁচাটি ধরি।।
যদি হয় ধনীর ছেলে, খাওয়াই ডিম ভেজে তেলে,
সে আপনজন সবাই ফেলে, জোগায় মেদের কড়ি।।

হাওরপাড়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটা অংশ “ভোলাভুলি সংক্রান্তি”। এক সময় কার্তিক মাসের শেষদিন হাওরপাড়ের পানি শুকাতে থাকলে প্রায় ঘরে ঘরেই এ উৎসব হতো। এখনও অনেক গ্রামে এই “ভোলাভুলি” খেলা হয়। কিন্তু এর গুরুত্ব কমে এসেছে অনেক। হাওরপাড়ের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এই “ভোলাভুলি” অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন।

রোববার কার্তিক মাসের শেষ দিন হওয়ায় নিকলী হাওরপাড়ে ভোলাভুলী কিছু আঁচ দেখা গেছে বরোদার নদের তীরবর্তীতে।

বাঁশ ও খড় দিয়ে মানুষের মতো (কাকতাড়ুয়া গোছের) একটি “ভোলা” তৈরি করা হয়। সন্ধ্যায় ছেলেমেয়েরা একত্রিত হয়ে এই ভোলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। পুড়তে পুড়তে এক সময় ছাই হয়ে যায় ভোলা। এ সময় বলা হতো-
“ভোলা পোড়, ভুলি পোড়
মশা-মাছি বাইর হ
টাকা-পয়সা ঘর ল
সংসারের জঞ্জাল দূর হ

“ভোলাভুলি”র অন্যতম আকর্ষণ ছিল- এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে গিয়ে কলাগাছের ডাল দিয়ে মানুষের “ভোলা” ছাড়ানো। এই ভোলা ছাড়ানোর সময় বলা হতো-
“ভোলা ছাড়, ভুলি ছাড়
বার মাইয়া পিছা ছাড়।
ভাত খাইয়া লড়চড়
পানি খাইয়া পেট ভর।
খাইয়া না খাইয়া ফোল।

হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠান মনে করা হলেও এটি হিন্দু-মুসলিম সবাই সমানভাবে পালন করে থাকেন। যদিও “ভোলাভুলি” নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে মাসব্যাপী চলে আয়োজন। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকেরা কার্তিক মাসকে নিয়ম মাস হিসেবে পালন করতো। এ সময় প্রতিদিন সকালে গোসল করে দেবতাকে ভোগ দেয়া হতো। আর মাসব্যাপী এই সংযমের শেষদিন “ভোলা সংক্রান্তি” হিসেবে এই “ভোলাভুলি” পালন করা হয়।[৪]

এ ব্যাপারে নিকলী উপজেলার (বর্তমানে কিশোরগঞ্জ বসবাস করেন) ধিরুয়াইল গ্রামের নাট্যজন আতাউর রহমান খান মিলন কিছু তথ্য দেন।

 

 

সহযোগিতায় : মামুন আহমেদ (ঠাকুরগাঁও), রাজিকা আক্তার লাকী (মজলিশপুর), মোঃ আল আমিন, মোঃ জুনাইদ হাসান রাজু।

সংগ্রহ সূত্র : আতাউর রহমান খান মিলন, বেদে বহর সরদার মোঃ তাবারক হোসেন, সরদার কন্যা মরিয়ম আক্তার ও তার মা, নিকলী উপজেলা জারইতলা ইউনিয়নের রোদারপুড্ডা বাজারসংলগ্ন রোদার নদ তীরবর্তী বেদে বহর ও কটিয়াদি উপজেলার গচিহাটা রেলস্টেশন সংলগ্ন বেদেবহর থেকে।

তথ্য সূত্র :
১. শেখ মোবারক হোসাইন সাদী অভিনীত বেদেনীর প্রেম নাটক থেকে।
২. বেদের মেয়ে জোসনা চলচ্চিত্র থেকে
৩. বেদের মেয়ে নাটক- পল্লী কবি জসিম উদ্দিন
৪. বেদে সম্প্রদায়, উইকিপিডিয়া।

 

সকল পর্ব :

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ২

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৩

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৪

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৫

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৬

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৭

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৮

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৯

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১০

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১১

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১২

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১৩

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১৪

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১৫

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১৬

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১৭

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১৮

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১৯

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ২০

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ২১

Similar Posts

error: Content is protected !!